আশা কর্মী ইউনিয়নের জেলা সম্মেলন, উলুবেড়িয়া

হাওড়া গ্রামীণ জেলা আশা কর্মী ইউনিয়নের গ্রামীণ জেলা তৃতীয় সম্মেলন রবিবার অনুষ্ঠিত হলো উলুবেড়িয়া কলেজে।
প্রথমেই জেলাসম্মেলনে আগত প্রতিনিধিদের পশ্চিমবঙ্গ আশা কর্মী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানানোহয়। আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৪ । এই সম্মেলন এমন একটা সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন আর জি কর মেডিকেল কলেজে ৩৬ ঘন্টা ডিউটিরত অবস্থায় মহিলা ডাক্তারের উপর নৃশংস অত্যাচার, খুন ও ধর্ষণের প্রতিবাদে সারাদেশ উত্তাল। “We Want Justice” শ্লোগানে সারাদেশের ডাক্তার নার্স সহ সাধারণ মানুষ বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তে প্রতিবাদ ধ্বনিত করছেন।  "মেয়েরা রাত দখল করো" কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের সাথে আমাদের ইউনিয়নের কর্মীরাও পথে নেমেছে। মহিলাদের উপর এধরণের পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে শপথ নেওয়া হয়। অপরদিকে সারা বিশ্ব সহ আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষ এক গভীর সংকটের সম্মখুীন। কর্মচ্যূতি, বেকারি , মজুরী হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষার সামান্য যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তার বিলোপ ঘটিয়ে, পরিষেবা ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচ ও  বেসরকারিকরণ করে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের উপর শোষণের মাত্রা তীব্রতর করেছে । গণতান্ত্রিক ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমস্ত মানষুই মনে করেন জনগণের যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যপরিষেবা দেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের। অথচ এই সম্মেলন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে উভয় সরকার স্বাস্থ্যপরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে চরম উদাসীন। ব্রিটিশ আমলে গঠিত “ ভোড় কমিশন “ বা স্বাধীন ভারতে গঠিত প্রায় সমস্ত কমিশন একই মত প্রকাশ করছে যে “মানুষ গর্ভ থেকে শ্মশান যাত্রা পর্যন্ত সমস্ত পরিষেবা ফ্রি পাবে “। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে স্বাধীন ভারতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার প্রান্তিক মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা বাড়ানোর পরিবর্তে ক্রমাগত কমিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারিকরণ করার নীতির ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ পণ্যে পরিণত। ২০০৫ সালে কেন্দ্রের ইউপিএ সরকার “ন্যাশনাল রুরাল হেলথ মিশন” এর মধ্য দিয়ে আশা প্রকল্প চালু করে ।সরকারি স্থায়ী স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে ভলান্টিয়ার নাম দিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ৮০০ টাকার বিনিময়ে মহিলা কর্মীদের সরকার নিয়োগ শুরু করে । ১০০০ জন পিছু একজন আশাকর্মী শিক্ষিত মহিলাদের মধ্য থেকে নিয়োগ হয়। এ রাজ্যে স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনে ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে কর্মরত প্রায় ৬০ হাজার আশাকর্মী প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা পরিশ্রম করে কাজ করে চলেছেন। মা-শিশু ও গ্রামীণ জনসাধারণের পরিষেবা দেওয়াই আশা কর্মীর প্রধান কাজ। কিন্তু বর্তমানে রুটিন মফিক কাজের বাইরে বহু কাজের বোঝা চাপানো হচ্ছে ।  খেলা, মেলা, পরীক্ষার ডিউটি, ভোট, পূজা, ন্যাপকিন বিক্রি , দুয়ারে সরকার, সরকারি আমোদ প্রমোদের ডিউটি এরকম নানা ধরনের অতিরিক্ত কাজের বোঝা আশাকর্মীদের ওপর চাপানো হয়। এসব কাজের কোন পারিশ্রমিক নেই। বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও সম্মানজনক বেতন নেই, স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি নেই, পেনশন নেই,কাজের কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, নির্দিষ্ট ছুটি নেই। এই সম্মেলন গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, কর্মক্ষেত্রে আশাকর্মীদের নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ কাজের জন্য আশাকর্মীদের গভীর রাতে গর্ভবতী মায়েদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। ফলস্বরূপ বহু জায়গায় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। উত্তরপ্রদেশের আশাকর্মী তারা দেবীকে গভীর রাতে  গর্ভবতী মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় দুষ্কৃতিদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে খুন হতে হয়েছে।  মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বহু কাজ করানো হয় অথচ অ্যন্ড্রয়েড ফোন দেওয়া হয় না। তাছাড়া রয়েছে প্রতিনিয়ত ফরম্যাট পরিবর্তন। অন্যায়ভাবে শোকজ করা, ফলস্বরূপ রাজ্যের বহু জায়গায় এমনকি আমাদের জেলাতেও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে । একদিকে পারিশ্রমিক না পাওয়া অন্যদিকে কাজের বোঝা সহ্য করতে না পেরে বহু আশাকর্মীকে অসুস্থ হয়ে অকালে প্রাণ দিতে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ আাশাকর্মী ইউনিয়ন জন্মলগ্ন থেকে আশাকর্মীদের সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর স্বীকৃতি , বেতন বৃদ্ধি কর্মক্ষেত্রে হয়রানির প্রতিবাদ, ফরম্যাট প্রথা বাতিলের দাবি সহ ১৩ দফা দাবিতে রাজ্য, জেলা ও ব্লক জুড়ে ধারাবাহিক শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছে । ইতিমধ্যেই রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব, মিশন অধিকর্তার কাছে মিছিল, সভা, ঘেরাও এর মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচিগুলিতেও এ জেলার আশা কর্মীরা সর্বশক্তি দিয়ে অংশগ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য গত ১৮ ই ডিসেম্বর ২০২৩ দিল্লি অভিযানে আমাদের জেলার আশা কর্মীরা অংশগ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে এই বছর কেন্দ্র ও রাজ্য বাজেটের ঘোষণায় আশা কর্মীরা হতাশ হয়ে রাজ্য, জেলা ও ব্লক জুড়ে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও পৌর স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে একই সাথে ধর্মতলায় বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় দুঘণ্টা অবরোধ করা হয়। প্রবল আন্দোলনের চাপে মাননীয়া স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রীমা ভট্টাচার্য মহাশয়া আমাদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। কিন্তু কোন আশ্বাস তিনি দেননি । নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলনের আহ্বান রেখে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করার মূহুর্তে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আচমকা চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে আমাদের ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদিকা ইসমত আরা খাতুন ও রাজ্য সভানেত্রী কৃষ্ণা প্রধান সহ প্রায় ৩০ জনকে রাস্তা থেকে টেনে হিজড়ে গ্রেফতার করে লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। একরাত্রি থানায় আটকে রেখে মিথ্যা কেশ দিয়ে দেয়। আপনারা জানেন এই ঘটনার মধ্যে আমাদের জেলার দুজন আশাকর্মীও যুক্ত ছিল। পরের দিন সবাইকে কোর্টে জামিন নিয়ে ছাড়ানো হয়। যে মামলা এখনো চলছে।পরের দিন ১৩ই ফেব্রুয়ারি সারা রাজ্যে প্রতিবাদ দিবসের ডাক দেওয়া হয়। দাবী আদায় করার আন্দোলন চলতে থাকে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সমস্ত দপ্তরে জানিয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে ১লা মার্চ থেকে কর্মবিরতি শুরু হয়। অনু জেলা এই কর্মসূচিতে অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে অংশগ্রহণ করেছেন। এছাড়াও কর্মক্ষেত্রে আশা কর্মীদের হয়রানির প্রতিবাদে বিভিন্ন জেলায় আশা কর্মীরা সরব হয়েছেন। ২০১১ সাল থেকে এ আই ইউ টি ইউ সি অনুমোদিত পশ্চিমবঙ্গ আশাকর্মী ইউনিয়নের নেতৃত্বে ধারাবাহিক শক্তিশালী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেশ কিছু দাবি আদায় হয়েছে । সাম্মানিক ভাতা ৮০০টাকা থেকে বেড়ে ৫২৫০টাকা হয়েছে । বোনাস একেবারেই ছিল না এখন ধাপে ধাপে বেড়ে বোনাস হয়েছে ৫৩০০ টাকা। অবসর ভাতা বলে কোন কিছু ছিল না। সেটা গত ২০২০সালে ৩ লক্ষ টাকা এবং এবছর ২০২৪ সালে সেটা বেড়ে ৫ লক্ষ টাকা হয়েছে । কোন বুধবার ছুটি থাকলে সেই টাকা কেটে নেওয়া হোত, আন্দোলনের ফলে এখন আর কাটা হয় না। Non JSY এর টাকা, গৃহ সমীক্ষার টাকা, মোবাইল রিচার্জ এর টাকা ইত্যাদি বেশ কিছু দাবি আদায় হয়েছে ইউনিয়নের নেতৃত্বে শক্তিশালী আন্দোলনের মাধ্যমে। বহু দাবি এখনো পূরণ হয়নি, এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ধারাবাহিক আন্দোলন। এই প্রয়োজনকে সামনে রেখেই হাওড়া গ্রামীণ জেলার তৃতীয় জেলা সম্মেলন। এই সম্মেলন থেকে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়েছেন সম্মেলনে উপস্থিত আশা কর্মীরা। এই সম্মেলন দাবি করছে ১) আর জি কর মেডিকেল কলেজে নারকীয় ঘটনার সাথে যুক্ত সমস্ত অপরাধীদে র দৃষ্টান্তমলূক শাস্তি দিতে হবে। ২) আশা প্রকল্পকে স্থায়ীভাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের ক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি কর্মীদের মতো বেতন, গ্রাচুইটি, পি এফ, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা দিতে হবে । ৩) ভলেন্টিয়ার তকমা লাগিয়ে ২৪ ঘন্টা কাজ করানো চলবে না, শ্রমিকের মর্যাদা দিয়ে কাজের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করতে হবে । ৪) আশাকর্মীদের সরকারি কর্মীর ন্যায় CL, ML, সাপ্তাহিক ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট করতে হবে । ৫) রুটিন মাফিক কাজের বাইরে অতিরিক্ত কাজের বোঝা (খেলা, মেলা, পরীক্ষার ডিউটি, দয়ুারে সরকার ইত্যাদি ) চাপানো চলবে না। ৬) কর্মক্ষেত্রে হয়রানি করা চলবে না ৭) কর্মরত অবস্থায় কোন আশাকর্মীর মৃত্যু হলে তার পরিবারকে ন্যূনতম ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অর্ডার কপি বের করতে হবে । ৮) কাজের জন্য অ্যান্ড্রয়েড ফোন দিতে হবে । কর্মক্ষেত্রে আশাকর্মীদের প্রমোশনের সুযোগ দিতে হবে । অবৈজ্ঞানিক ফরম্যাট প্রথা বাতিল করে নির্দিষ্ট বেতন দিতে হবে । ৯) ১০ বছর ও ১৬ বছর বয়সের টিকাকরণের টাকা দিতে হবে । ১০) BPHC এবং PHC সংলগ্ন সাব সেন্টারে PLI এর টাকা দিতে হবে । ১১) উৎসাহ ভাতা ভাগে ভাগে না দিয়ে মাসের প্রথমে একসাথেই দিতে হবে । ১২) রাত্রিতে গর্ভবতী মায়েদের সঙ্গে আশা কর্মীদের যাওয়া বন্ধ করতে হবে। ১৩) NCDর সরলীকরণ করতে হবে। ১৪) স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেসরকারিকরন ও ব্যবসায়ীকরন বন্ধ করতে হবে।
আজকের এই সম্মেলন থেকে মধুমিতা মুখার্জিকে সভানেত্রী, রিনা ভট্টাচার্যকে সম্পাদিকা ও সুমতি নস্করকে কোষাধ্যক্ষ করে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। এই জেলা কমিটি আগামী দিনে কর্মক্ষেত্রে আশাকর্মীদের উপরোক্ত দাবি পূরনের জন্য শক্তিশালী  আন্দোলন সংগঠিত করবেন এবং ধারাবাহিক আন্দোলনে রাজ্যের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সম্মেলন শেষে উপস্থিত আশা কর্মীরা আরজিকর কলেজে তরুণী ডাক্তারের ধর্ষণ ও খুনের বিচারের দাবিতে একটি বিক্ষোভ মিছিল সংঘটিত করে এই মিছিল উলুবেরিয়া কলেজ থেকে এসডিও অফিস পর্যন্ত যায় এবং সেখানে সংক্ষিপ্ত সভা করে আগামী দিনে "তিলকত্তামার" বিচারের দাবিতে আন্দোলন করার অঙ্গীকার করে।

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com
⏳ নিউজ লোড হচ্ছে...