ফিলিস্তিনের সমর্থনে কলকাতায় মানুষের ঢল




বিশেষ সংবাদদাতা, 



 ফিলিস্তিনের গাজায় আগ্রাসন ও গণহত্যা বন্ধের দাবিতে কলকাতায় এক ঐতিহাসিক বিক্ষোভ, পদযাত্রা ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। 


 শুক্রবার ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অবিলম্বে আগ্রাসন বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি করে অসহায় নিরীহ মানুষের মৃত্যুমিছিল বন্ধের দাবিতে সোচ্চার হল কলকাতা। 



'ফ্রেন্ডস অফ প্যালেস্টাইন' ফোরামের আহ্বানে সাড়া দিয়ে। শুক্রবার জুম্মার নামাযের পর কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের কাছ থেকে বিশাল ঐতিহাসিক পদযাত্রা বের হয়। 


শিশু, নারী, পুরুষ মিলিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজারের মতো শান্তিকামী মানুষ শামিল হন এবং পদযাত্রায় পা মেলান। 

 প্রতিবাদী মিছিলটি কলকাতার মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে গিয়ে মিলিত হয় এবং সেখানে সমাবেশ হয়। 

 মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন একযোগে এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভের আয়োজন করে।


 সমাবেশ থেকে এক প্রতিনিধি দল পার্কস্ট্রিটে অবস্থিত মার্কিন কনসুলেটে গিয়ে গাজায় একতরফা ইজরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে স্মারকলিপি জমা দিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় সংঘাত শুরুর পর থেকে এদিনের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছিল কলেবরে সবথেকে বড়।


 বক্তব্য রাখেন রাজ্যের মন্ত্রী জাভেদ অহমেদ খান, মানবাধিকার কর্মী ও বন্দিমুক্তি আন্দোলনের নেতা ছোটন দাস, বিশপ অলোক মুখার্জি, বেলুড় মঠের স্বামী পরমানন্দ গিরি মহারাজ, মজলিসে মুশাওয়ারাত ও মিল্লি ইত্তেহাদ পরিষদের আব্দুল আজীজ, সোহন সিং আতিয়ানা, ইমামে ঈদায়েন ক্কারী ফজলুর রহমান, জামাআতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য সভাপতি ডা. মসিহুর রহমান, খিলাফত কমিটির পক্ষে নাসির আহমেদ, শাকীল আহমেদ-সহ বহু বিশিষ্টজন। সঞ্চালনা করেন শাদাব মাসুম।

 তাঁরা সকলেই আগ্রাসন বন্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। ইজরায়েলের জন্মবৃত্তান্ত প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদেরকে নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে বসিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে মূলত মার্কিন ও ব্রিটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় রাষ্ট্রসংঘ ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।


 ১০ শতাংশ ইহুদিকে দেওয়া হয় ৫৭ শতাংশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। আর ফিলিস্তিনকে দেওয়া হয় ৪৩ শতাংশ। আর এখন ইজরায়েল প্রায় ৯০ শতাংশ ভূখণ্ড জবরদখল করে নিয়েছে। অথচ সারা বিশ্ব নীরব। গাজা উপত্যকাকে ১৬-১৭ বছর ধরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। হামাস চাইছে স্বাধীনতা।

 এই অপরাধেই তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রী জাভেদ খান বলেন, ইজরায়েলকে জব্দ করতে হলে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও নামাযে দুয়ার পাশাপাশি ইজরায়েলী পণ্যসামগ্রী বয়কট করতে হবে। নারী, শিশুদের কী অপরাধ, কেন তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে – সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যুদ্ধ বন্ধে রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাব পাস হয়েছে। ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১১৪টা দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। 

আফসোস নরেন্দ্র মোদির ভ্রান্ত বিদেশনীতির কারণে ভারত রাষ্ট্রসংঘে ভোটদানে বিরত থেকেছে। তবুও আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব হল আওয়াজ ওঠানো।


 এক বক্তব্যে জামাআতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য সভাপতি ডা. মসিহুর রহমান বলেন, বিশ্বের যেখানেই অন্যায় হয়েছে এই কলকাতা সর্বদাই তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে। কলকাতায় সুদুর আফ্রিকা থেকে নেলসন ম্যান্ডেলা এসেছেন, ফিলিস্তিনের ইয়াসের আরাফাত এসেছেন। এটাই কলকাতার ঐতিহ্য পরম্পরা। ইজরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করছে, চরম মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে, অকাতরে ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যা চালাচ্ছে। ইজরায়েলকে এসব গরহিত অপরাধে আন্তর্জাতিক আদালতের কাঠগড়ায় তোলা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। আরও বলেন, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একজন ফ্যাসিস্ট। সে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিজের গদি পাকা করতে চাইছে। তাই নিজের ধর্মগ্রন্থের অপব্যাখ্যা করে চলমান যুদ্ধকে বৈধতা দিচ্ছে। তাঁর মতে, এটা শুধু গাজার যুদ্ধ নয়, এটা মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য সাগর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূখণ্ড গ্রাস করে গ্রেটার ইজরায়েল বানানোর লক্ষ্যে এই যুদ্ধ। যায়নবাদীরা তাদের মানচিত্রে অনেক আগেই তাদের স্বপ্নের গ্রেটার ইজরায়েল এঁকে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, আদানি কোম্পানী ইজরায়েলের হাইফা বন্দর কিনেছে। ভারত থেকে গ্রিস পর্যন্ত করিডোর হবে। এও গ্রেটার ইজরায়েলের সহযোগী প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই লড়াই মানবতার পক্ষে, সাম্রাজ্যবাদ এবং ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে। গান্ধী থেকে নেহরু, ইন্দিরা থেকে বাজপেয়ী ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু শুধুমাত্র আদানির স্বার্থে মোদি সরকার ভিন্ন সুর ধরেছেন। আরেকটি কারণ হল ২০২৪ এর ভোটের স্বার্থ। তিনি এও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশ গড়ে ব্রিটিশ, ফরাসি ও মার্কিনিরা সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, ধ্বংস ও গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের কাছ থেকে মানবাধিকার, সভ্যতার পাঠ নেওয়ার কিছু নেই। তাদের সবার হাত রক্তে রাঙানো। ইমামে ঈদায়েন বলেন, আল্লাহ ফিলিস্তিনিদের রক্ত, জান ও মালের কুরবানী, তাদের শাহাদাত কবুল করুন। হামাস ইজরায়েলের গর্ব, দর্প সব চূর্ণ করে দিয়েছে। আবাবিল পাঠিয়ে আল্লাহ যেমন পবিত্র কাবা শরিফকে হেফাজ করেছেন, তেমনি বায়তুল মুকাদ্দাসকেও তিনি নিশ্চিত হেফাজত করবেন। বিজয় এখন সময়ের অপেক্ষা। হামাস সম্পর্কে মানুষকে ভুল ও বিদ্বেষমূলক একপেশে তথ্য দিচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়া। তাই মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে জনমত গঠন করার আহ্বান জানান তিনি। আব্দুল আজীজ সাহেব বলেন, হামাস সন্ত্রাসী নয়, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামী। যেমন আমাদের পূর্বপুরুষরাও ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তি পেতে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিল, দেশের জন্য শহিদ হয়েছিল। ব্রিটিশরা তাদেরকে সন্ত্রাসী বললেও তারা ছিলেন দেশপ্রেমী। তাদের আত্মবলিদানের জন্যই ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। পরের বছর ১৯৪৮ সালে ইজরায়েলকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়, অথচ তারপর সাড়ে সাত দশক কেটে গেছে, আজও ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। ২৭ দিন ধরে হামাস প্রতিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে। তিনি এও বলেন, হামাস তাদের অনুগত নয়, তাই হামাসকে তাদের পছন্দ নয়। ৫৭টা মুসলিম দেশ ঐক্যবদ্ধ হলে ইজরায়েলকে ভিক্ষা করতে হবে। সোহন সিং বলেন, যুদ্ধের একমাত্র কারণ হল অস্ত্র ব্যবসা। এটাই পশ্চিমাদের পুঁজি। আর মার্কিন সমরাস্ত্র বা আর্মস-লবিকে নিয়ন্ত্রণ করে ইহুদিরা। ভারত সরকার এখন আমেরিকা ও ইজরায়েলের পিট্টু হয়েছে। সব ক্ষেত্রে এই সরকার ব্রিটিশের মতো ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি নিয়ে চলেছে। খিলাফত কমিটির নাসির আহমেদ বলেন, ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিতে মুসলিম হওয়ার প্রয়োজন নেই, বিবেকবান মানুষ হলেই যথেষ্ট। তিনি বলেন, ইজরায়েল সুপার পাওয়ার নয়; তারা কাপুরুষ। আর ফিলিস্তিনিরা বেঁচে থাকলে গাজী আর মারা গেলে শহিদ। উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সবাই দোয়া করবেন আল্লাহ যেন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কবুল করে নেন এবং সেখানকার মজলুম মানুষদের দাজ্জাল ইজরায়েল, আমেরিকার থেকে হেফাজত করেন।

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com
⏳ নিউজ লোড হচ্ছে...