রাজেন্দ্র নাথ দত্ত:মুর্শিদাবাদ:
মুর্শিদাবাদের আমের ভ্যারাইটির পাশাপাশি স্বাদে ও গন্ধে জুড়ি মেলা ভার। এই জেলার আমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে নবাবদের নাম। বলা হয়, নবাবের বাগানে পেস্তা, তোতা, চম্পা, সারেঙ্গা, সাহুপসন্দ, জাহান্নারা, চন্দনকোষা, কোহিতুর, কালাপাহাড়, বীরা, হিমসাগর, ল্যাঙড়া, দিলসাধ, কিষানভোগ, রানিপসন্দ, বেগম পসন্দ, দিল পসন্দ সহ প্রায় ২০০ প্রজাতির আমগাছ ছিল। নবাবি আমল থেকে মুর্শিদাবাদের আমের সুখ্যাতি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছয়। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমের বেশ কিছু প্রজাতি মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে হারিয়ে গিয়েছে এবং আরও কিছু প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। আম বাগানের মালিক ও চাষিদের দাবি, বর্তমানে ৪০-৫০টি প্রজাতির আমের অস্তিত্ব রয়েছে। যদিও বাজারে হিমসাগর, ল্যাঙড়া, রানি, চম্পা, বোম্বাই সহ হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতির আম দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে নবাবি আমলের বিভিন্ন প্রজাতির আম ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য উদ্যান পালন দপ্তর। রাজ্যের বিচার বিভাগের অধীনে থাকা মুর্শিদাবাদ এস্টেটের খানপুর মৌজায় ২৬.৩৫ একর এবং কদমশরিফ মৌজায় ৭.৩৩ একর জমি চিহ্নিত করে মুর্শিদাবাদের মাটি থেকে হারিয়ে যাওয়া নানা প্রজাতির আমগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য বিচার বিভাগ থেকে উদ্যান পালন দপ্তরে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
মুর্শিদাবাদের নবাবদের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁ এবং পরবর্তী নবাবরা আমের সৌখিন ছিলেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিঘের পর বিঘে জমিতে আমবাগান গড়ে ওঠে। আমবাগান দেখভাল ও পরিচর্যার জন্য নবাবরা অভিজ্ঞ লোক নিযুক্ত করতেন। তাঁদের আম কেরানি বা আম পেয়াদা বলা হতো। তাঁরা সারাদিন বাগানে পড়ে থাকতেন। সন্তানের মতো অতি যত্নে গাছের পরিচর্যা করতেন। নবাবদের উৎসাহে আম পেয়াদারা সংকরায়ণ ঘটিয়ে নতুন নতুন আমের প্রজাতি তৈরি করতেন। নতুন প্রজাতির আমের নামকরণ করতেন নবাবরা। তবে কোহিতুর আমের নামকরণ কোনও এক আম কেরানি করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নবাবি আমলের আমের প্রজাতিগুলি হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক প্রজাতির আমের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তোতা, পেস্তা, দিলপসন্দ, বেগম পসন্দ, চন্দনকোষা, কোহিতুর, কালাপাহাড় প্রভৃতি প্রজাতির আম লালবাগের বাগানগুলি খুঁজলে হয়তো দুই একটি পাওয়া যেতে পারে। মুর্শিদাবাদ জেলা হেরিটেজ অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির যুগ্ম সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, কয়েক দশক আগেও লালবাগ শহরজুড়ে আমের বাগান ছিল। গত এক দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাগান কেটে বসতি গড়ে উঠেছে। ফলে অনেক দুর্লভ প্রজাতির আম হারিয়ে গিয়েছে। আবার যেগুলি রয়েছে, সেগুলির ঠিকমতো দেখভাল ও পরিচর্যা হয় না। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এর ফলে হারিয়ে যাওয়া নবাবি আমলের আমের প্রজাতিগুলি ফিরে আসবে।
