জন্মদিনে শুভেচ্ছা বীর বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী #আসফাক_উল্লাহ_খান :




১৯২৭ সালের ১৮ই ডিসেম্বর | ফৈজাবাদ জেল | সেদিন রাতে ছিল হাড় হিম করা ঠান্ডা | জেলার সাহেব এক কয়েদিকে মনে করিয়ে দিলেন এটাই তাঁর জীবনের শেষ রাত | না সেই রাতে ঘুমাতে পারেননি ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত কয়েদিটি | বজ্রাসনে বসে কোরান শরিফের বেশ কয়েকটা আয়াত পাঠ করে কোরানকে চুম্বন করেছিলেন সেই কয়েদি |

তাঁর জীবনে আক্ষেপ ছিল একটি – রামপ্রসাদ বিসমিল, রোশন সিংহ আর রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ছিলেন হিন্দু | তাই তারা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করতেন এবং বলে গিয়েছিলেন পরের জন্মে ফিরে এসে দেশ স্বাধীন করবেন | কিন্তু তিনি নিজে মুসলমান তাই তাঁর ধর্মে পুনর্জন্মের কথা নেই | তবুও মনে মনে ভাবতেন যদি কোনোদিন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁকে স্বর্গে স্থান দেন তাহলে স্বর্গের পরিবর্তে তিনি আবার ভারতবর্ষের মাটিতেই জন্মগ্রহণ করার সুযোগ চেয়ে নেবেন |

১৯২৭ সালের ১৫-ই ডিসেম্বর শুক্রবার তিনি হেকে প্রহরীর চেয়ে নেন একটি কাগজ কলম | তারপর ভারতবর্ষের জনসাধারণের উদ্দেশ্যে উর্দুতে লিখে যান “আজ আর আমার কাছে সময় আর সুযোগ কোনোটাই অবশিষ্ট নেই | যদি থাকতো তাহলে আমি আমি দলিল দস্তাবেজ সহকারে আপনাদের সামনে প্রমান করে দিতে পারতাম যে ধর্মের নামে হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে সরকারের মদতপুষ্ট বেশ কয়েকটা গুপ্ত মৌলবাদী সংগঠন | এদের উদ্দেশ্য মানুষের মঙ্গল বা ধর্মের উৎকর্ষ সাধন নয় বরং ধর্মের নামে দেশের মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করা | আমি জানি মৌলবী নিয়ামতুল্লা কাদিয়ানী কে ছিলেন | যাকে কাবুলে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলা হয়েছিল | কাদিয়ানী একজন ব্রিটিশ গুপ্তচর ছিলেন আর ভারতের ইংরেজ সরকারের নির্দেশে সি আই ডি বিভাগের ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ খানবাহাদুর তসদ্দুক হুসেন ওনার কাছে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাধানোর এক সুচতুর পরিকল্পনা নিয়ে গিয়েছিলেন | কিন্তু কাবুল সরকার এই ষড়যন্ত্র সঠিক সময়ে ধরে ফেলে আর সেই বিষ ছড়ানোর আগেই মৌলবী নিয়ামতুল্লা কাদিয়ানীকে হত্যা করে | তাই আমি আপনাদের সবাইকে সতর্ক করে যাচ্ছি যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে আমাদের দেশকেও দ্বিখণ্ডিত করার চক্রান্ত চলছে | আপনারা ভুলেও কখনো সেই ফাঁদে পা দেবেন না | আমি জানি দেশকে আমি মাতৃভূমি বলে সম্বোধন করি বলে অনেকের কাছেই আমি বিরাগভাজন | কিন্তু যে মাটির শস্য খেয়ে বড়ো হয়েছি আর শেষ পর্যন্ত আমি যে মাটিতেই মিশে যাবো তাকে মাতৃভূমি বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই | শেষ অনুরোধ যে কাজ আমরা অসম্পূর্ণ রেখে গেলাম সেটা আপনারা সম্পূর্ণ করুন |”


১৯২৭ সালের ১৯শে ডিসেম্বর | ভোরবেলা | পবিত্র কোরানকে কয়েকবার চুম্বন করলেন | তারপর নিজেই রক্ষীকে ডেকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে বুক ফুলিয়ে চলতে লাগলেন তিনি | ফাঁসির মঞ্চে উঠে বললেন “আমার হাতে কোনোদিনই কোনো মানুষের রক্ত লাগেনি | খুদার আদালতেই আমার ন্যায় বিচার হবে |” তারপর ফাঁসির দড়িকে চুম্বন করলেন | কালো কাপড়ে ঢাকা হল তাঁর মুখ | গলায় পরিয়ে দেওয়া হল ফাঁসির রজ্জু | মুহূর্তেই পাটাতন সরে গেল | ফাঁসির রজ্জু কিছুক্ষণ কেঁপে স্থির হয়ে গেল | অনন্তলোকে পাড়ি দিলেন তিনি |

আসফাক উল্লাহ খান | পুরো নাম আসফাক উল্লাহ খান ওয়ার্সি হসরত | জন্ম ১৯০০ সালের ২২-শে অক্টোবর শাহজাহানপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে কদনখৈল জালালনগরে | বাবা সফিকুর রহমান উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এক উচ্চপদস্ত কর্মচারী ছিলেন | মা মাজহুর-উন-নিসার বেগম ছিলেন আধুনিকমনস্কা | ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন আসফাক | পড়তেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে | ভালোবাসতেন ইতিহাস | ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকি, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বসন্ত বিশ্বাস সকলের জীবনে পড়েছিলেন খুঁটিয়ে | উদ্বুদ্ধ হন দেশপ্রেমের চেতনায় | সংস্কৃতিতে এম এ করেছিলেন তিনি |

আসফাক নিজে ছিলেন কবি | উর্দু ও হিন্দিতে হসরত নামে কবিতা লিখতেন | সেই সময় ব্রিটিশরা ইচ্ছাকৃত ভাবে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভেদের বীজ বপন করে দেয় | ফলে প্রায়ই দাঙ্গা হত | হিন্দু আর মুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের অভাব ছিল | আসফাকের বড়দা রিয়াসাত উল্লাহ খান ছিলেন পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সহপাঠী | রামপ্রসাদ বিসমিল ছিলেন বিরাট কবি এবং বড় বিপ্লবী | উর্দু তথা হিন্দীতে রামপ্রসাদ বিসমিলের দেশপ্রেমের অসাধারণ কবিতা শুনে আসফাক প্রভাবিত হন | তিনি দাদাকে বলেন রামপ্রসাদ বিসমিলের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে | একদিন পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল শাহাজানপুরের কাছে খনৌত নদীর ধারে বসে একটা গোপন মিটিং করছিলেন, সেখানে উপস্থিত হন আসফাক | বিসমিল উর্দুতে তার লেখা নতুন একটা কবিতার কয়েকটা পংক্তি শোনাচ্ছিলেন উপস্থিত সবাইকে, আসফাক সেই লাইনগুলির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কবি ফিরাখ গোরাখপুরীর লেখা একটা কবিতার কয়েকটা স্তবক শোনান | বিসমিল চমকে যান | যখন তিনি জানতে পারেন আসফাক নিজেও কবিতা লেখে তখন তাঁকে বাড়িতে দেখা করতে বলেন বিসমিল | পরদিন সকালেই তার নিজের লেখা কয়েকটা কবিতা নিয়ে রামপ্রসাদ বিসমিলের বাড়িতে আসেন আসফাক | সেই থেকেই শুরু বন্ধুত্বের | প্রথমে কবিতা নিয়ে চর্চা হত দুজনের | কিন্তু রামপ্রসাদ বিসমিল যখন বুঝলেন আসফাকের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ বোনা আছে তখন তিনি তার গুপ্ত সংগঠন ‘মাতৃবেদী’-র সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিলেন | পুরোপুরি হিন্দুদের নিয়ে গঠিত সেই দলের সদস্য হয়ে যান আসফাক | ১৯২৪ সালের ৩রা অক্টোবর কানপুরে যখন শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জি, রামপ্রসাদ বিসমিল ও আরো কয়েকজনের মিলে তাদের নতুন দল ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিক এসোসিয়েশন’-এর ঘোষণা করেন তখন অনেকে আপত্তি করলেও আসফাকুল্লা খানকে সদস্য করে নিলেন পণ্ডিতজি | এমনকি ভাই রিয়াসতের বেশ কিছু গুলি সমেত লাইসেন্স করা পিস্তল আসফাক তুলে দিয়েছিলেন পন্ডিতজির হাতে |


রামপ্রসাদ বিসমিল আর আসফাকের গভীর বন্ধুত্ব ছিল | রামপ্রসাদ বিসমিল প্রায়ই শাহজাহানপুরের আর্য সমাজ মন্দিরে ধ্যান করতেন | সেখানে প্রায়ই আসতেন আসফাক | ‘সরফরোশী কি তমন্না অব হমারে দিল মে হয়, দেখনা হয় জোর কিতনা বাজু-এ-কাতিল মে হয়’ কবিতাটি সেখানে বসেই বিসমিল আসফাককে শুনিয়েছিলেন | আসফাক সবসময় নিজের কাছে একটা পিস্তল রাখতেন | এরকমই একটা দিনে স্থানীয় অনেক মুসলমান হাতে অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে আর্য সমাজ মন্দিরের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করে | বিসমিল আর আসফাক তখন মন্দিরের চাতালে আড্ডা দিচ্ছেন | বাইরে গন্ডগোল বুঝেই আসফাক বুঝতে পারেন কি হতে চলেছে | কোমর থেকে পিস্তল বের করে বাইরে বেরিয়ে আসেন আসফাক | চিৎকার করে বললেন ” আমিও একজন সাচ্চা মুসলমান | কিন্তু এই মন্দিরের প্রত্যেকটা ইঁট আমার কাছে প্রাণের থেকেও প্রিয় | আমার কাছে মন্দির আর মসজিদের কোনো আলাদা অর্থ নেই | খবরদার কেউ একবারও ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে তাকে আমার গুলির নিশানা বানাতে পিছপা হবোনা | যদি মারামারি করতেই হয়ে তবে রাস্তায় গিয়ে করো | এখানে নয় |” আসফাকের এই কথা শুনে সামনে এগোতে আর সাহস পাননি হামলাকারীরা |

আরেকবারের ঘটনা | আসফাক উল্লাহ খান ভীষণ অসুস্থ | জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল | সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন তিনি | তখনও মাঝে মাঝে ‘রাম’ বলে উঠছেন | বাড়ির সবাই হতবাক | রামের নাম তো হিন্দুরা নেয় | রামপ্রসাদ বিসমিল কিন্তু কখনই আসফাকের বাড়িতে যেতেন না কারণ তাদের বন্ধুত্ব পছন্দ করতেন না আসফাকের পরিবার | কিন্তু সেবার বন্ধুর বিপদের কথা শুনে রামপ্রসাদ বিসমিল ছুটে আসেন আসফাকের বাড়িতে | পরম স্নেহে কয়েকবার মাথায় হাত বোলাতেই আসফাক জড়িয়ে ধরলেন বিসমিলকে | তখন সবাই বুঝলেন “রাম” বলতে আসফাক কি বোঝাতে চাইছিলেন | পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল গোরখপুর জেলে বসে ‘আত্মকথা’ বলে যে বইটা লিখেছিলেন সেখানে এই ঘটনাগুলোর উল্লেখ আছে | দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে এই বন্ধুত্বে ধৰ্ম নিয়ে সংঘাত কোনোদিনই বাধেনি |

১৯২৫ সালের ৮ই আগস্ট সন্ধ্যায় শাহজাহানপুরে হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন আর প্রবাসী অনুশীলন সমিতির মোট দশ জনকে নিয়ে রামপ্রসাদ বিসমিল যে গোপন মিটিং করেছিলেন সেখানে ডাকাতির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করার সময় আসফাক ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন | তার যুক্তি ছিল ‘হিন্দুস্থান রিপাবলিকান এসোসিয়েশন’ তখনও যথেষ্ট নতুন সংগঠন | বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু সম্পন্ন বাড়িতে ডাকাতি করলেও একটা চলন্ত ট্রেন মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে মাত্র দশ জন মিলে সরকারি অর্থ লুট করার প্ল্যানে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে | তাই এই পরিকল্পনা সফল ভাবে কার্যকর করার জন্যে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে | সেই কথা শুনে কয়েকজন বলেই ফেলেন “পণ্ডিতজি এইজন্যেই আপনাকে আমরা মানা করেছিলাম কোনো মুসলমানকে আমাদের সাথে নিতে | মুসলমানদের স্বদেশপ্রীতি নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে |” এই কথায় আসফাক প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বলে ওঠেন “রামপ্রসাদ বিসমিল আমাদের সবার নেতা | আমার গুরুও তিনি | তাই তার আদেশ অন্যদের মতো আমিও মেনে চলতে বাধ্য | কাল সারা দুনিয়া একজন পাঠানের সাচ্চা দেশপ্রেম আর পরাক্রম দেখতে পাবে |”

পরেরদিন সেটাই করে দেখিয়েছিলেন আসফাক উল্লাহ খান | কাকোরী ট্রেন ষড়যন্ত্রের ঘটনার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৯৭ সালের ১৯-শে ডিসেম্বর জাতীয় দূরদর্শনে ‘সরফরোশী কি তমন্না’ বলে একটা ডকুমেন্টারি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়েছিল | সেই সময় কাকোরী ট্রেন ডাকাতিতে যারা প্রত্যক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে একমাত্র বিপ্লবী মন্মথ নাথ গুপ্ত জীবিত ছিলেন | তিনি সকলকে শুনিয়েছিলেন আসফাক উল্লাহের কাহিনী | | কাকোরী ট্রেন ডাকাতিতে ব্যবহৃত চারটে মাউজার পিস্তলের মধ্যে একটা ছিল আসফাকের হাতে | ট্রেন থামতেই তিনি সেই পিস্তল হাতে লাফ দিয়ে নেমে শহীদ চন্দ্রশেখর আজাদের সাথে ইঞ্জিনের ঠিক পিছনের গার্ডের কামরায় ঢুকে দুজনে মিলে প্রথমেই অবলীলায় টাকা ভর্তি লোহার সেই প্রচণ্ড ভারী সিন্দুকটা দরজা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন | ট্রেনের গার্ড তখন নিজের কেবিন থেকে নেমে কোন কামরা থেকে শিকল টানা হয়েছে দেখার জন্যে পিছনের দিকে এগোচ্ছিলেন | এবার লাফ দিয়ে নিচে নেমে আসফাক পিছনের দিকে দৌড়ে গার্ডের কানের কাছে পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে মাটিতে শুইয়ে রাখেন | সেই সময় মন্মথ নাথ ও আরো কয়েকজন মিলে তালাটা ভাঙতে না পেরে সিন্দুকের উপরের অংশে একটা ফাঁকের মধ্যে ছেনির মুখ ঢুকিয়ে হাতুড়ির বাড়ি মেরে মেরে বাক্সের মাথাটা ফাটিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলেন | কিন্তু কাজ হচ্ছিল না | এদিকে হাতে সময় ছিল খুব কম | যে কোনো মুহূর্তে কাছের আলমনগর স্টেশন থেকে পুলিশের পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল | বিপদ বুঝে আসফাক দৌড়ে আসেন | হাতের মাউজার পিস্তলটা কিশোর মন্মথর হাতে দিয়ে উনি হাতুড়িটা নিজের হাতে নিয়ে সিন্দুকটার মাথায় গোঁজা ছেনির উপর ক্রমাগত বাড়ি মারতে লাগলেন | সেই সময় উল্টো দিক থেকে একটা ট্রেন আসতে দেখে রামপ্রসাদের নির্দেশে সবাই কয়েক মুহূর্তের জন্যে মাথা নীচু করে বসে পড়েন | সেই সময়ই কোনোভাবে অনভ্যস্ত মন্মথ নাথ গুপ্তের ট্রিগারে আঙুলের চাপে গুলি ছিটকে লাগে সেই আহমেদ আলীর গায়ে | একটা ডাকাতি সাথে নরহত্যার ঘটনা জুড়ে গেলো | বাইরে কিছু অস্বাভাবিক ঘটেছে বুঝে ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী জানলার পাল্লা তুলে বাইরে দিকে তাকিয়ে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছিলেন | এদিকে অমানুষিক গায়ের জোরে ক্রমাগত হাতুড়ির বাড়ি মেরে আসফাক উল্লাহ খান সিন্দুকের মাথায় বিরাট একটা ফাঁক বার করে ফেলেছেন | তারপরের ঘটনার কথা তো সবারই জানা |

কাকোরী ট্রেন ডাকাতির সময় রামপ্রসাদ বিসমিলের নির্দেশে সবাই একটা করে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন | তাই সিন্দুক ভাঙতে না পেরে সবাই আসফাককে কুমার-জী বলে ডাকছিলেন | তাই আলমনগর পুলিশের কাছে ট্রেনের গার্ড তার বয়ানে আসফাক উল্লাহর নাম কুমার-জী বলে জানিয়েছিলেন | তাই আশফাক-কে সনাক্ত করতে পুলিশ প্রথমে বিভ্রান্তিতে পড়ে |

ব্রিটিশরা কেঁপে গিয়েছিল ওই ঘটনায় | স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তদন্ত করতে এসেছিল কাকরী রেল ডাকাতির | আসফাক বহুদিন আত্মগোপন করেছিলেন | শাহজাহানপুর থেকে কোনোরকমে লুকিয়ে প্রথমে নেপালে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফিরে এলেন কানপুরে | সেখানে গনেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী নামে ওনার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ‘প্রতাপ প্রেস’ বলে একটা ছাপাখানা ছিল | দুদিন ওই ছাপাখানায় আত্মগোপন করে থাকার পর উনি বেনারস হয়ে ট্রেনে বিহারের ডালটানগঞ্জে আসেন | স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তখন আসফাকের পিছনে পড়ে আছে | সমস্ত উত্তরপ্রদেশ জুড়ে তল্লাশি চালাচ্ছে | ডালটানগঞ্জে আসফাক একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে করণিকের চাকরি জুটিয়ে নাম পাল্টে থাকতে লাগলেন | ইতিমধ্যে যুক্তপ্রদেশের পুলিশ ওনার নামে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জেলা পুলিশের সদর দফতরে ছবি শুদ্ধ গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠায় | তাই ডালটানগঞ্জ আর নিরাপদ নয় বুঝে দশ মাস চাকরি করার পর আসফাক আবার কানপুরে গনেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর কাছে ফিরে আসেন | বিদ্যার্থীজীর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে আসফাক ভূপালে ওনার বড় ভাই রিয়াসাত উল্লা খানের কাছে যান | পুলিশ সেখানেও আসফাকের পিছু ধাওয়া করে | নিরুপায় আসফাক এবার পালালেন রাজস্থানে | সেখানে ওনার দাদার বন্ধু অর্জুনলাল শেঠি ওনাকে কিছুদিনের জন্যে আশ্রয় দিলেন | কয়েকদিন বাদে যুক্তপ্রদেশের একটা টিম গোপন সূত্রে খবর পেয়ে রাজস্থানে আসে | পুলিশ অর্জুনলালের বাড়ি পৌঁছনোর আগেই আসফাক পালিয়ে যান আর অনেক ঘুরপথে আবার বিহারের ডালটানগঞ্জে ফিরে এসে আরেকবার নাম পাল্টে নতুন এক জায়গায় চাকরি নিয়ে অন্য ডেরায় থাকতে আরম্ভ করলেন | তিনি ভালোই বুঝতে পারছিলেন এই ভাবে জায়গা পাল্টে পাল্টে বেশিদিন পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে থাকা সম্ভব হবে না | তাই এবার তিনি ভারত থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন | সেই সময় আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোয় গদর পার্টির একটা শক্তিশালী সংগঠন ছিল | প্রবাসী ভারতীয়রা সেখান থেকেই ভারতের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিরোধী আন্দোলনে বিশেষ করে গুপ্ত ও নিষিদ্ধ বিপ্লবী সংগঠনগুলোকে নানা ভাবে সাহায্য করতেন | আসফাক গদর পার্টির বিশিষ্ট নেতা লালা হরদয়াল সিংহের সাথে যোগাযোগ করেন | তাঁর পরামর্শে আসফাক আমেরিকায় যাওয়ার একটা পাসপোর্ট জোগাড় করার জন্যে কোনোরকমে দিল্লী পৌঁছান | সেখানে তার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তারই স্কুলের এক পাঠান সহপাঠী বন্ধুর সাথে | ক্লান্ত আসফাক অনেক দিন বাদে বন্ধুর দেখা পেয়ে দারুন উৎফুল্ল হন | এরপর অনেক রাত পর্যন্ত দুজনে সেই বন্ধুর বাড়িতে গল্পগুজব করে খাওয়া দাওয়া সেরে আসফাক নিজের হোটেলের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়েন | পরদিন সকালেই তার দিল্লী ছাড়ার কথা | কিন্তু ঘুম ভাঙার অনেক আগেই ভোর রাতে দিল্লী গোয়েন্দা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টার ইকরামুল হক হোটেলের ঘরেই আসফাক উল্লাহ খানকে গ্রেফতার করলেন | আসলে অর্থ পুরস্কারের লোভে সেই পাঠান বন্ধুই ধরিয়ে দিয়েছিলেন আসফাকুল্লাকে |
 
প্রায় একই সময় কাকরী কান্ডের আরেক ফেরার আসামি বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ বক্সী গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন | তাই লখনৌতেই আবার স্পেশাল সেশন জজ জে আর ডব্লিউ বেনেটের অধীনে ১৯২৬ সালের ৭-ই ডিসেম্বর আগের সেশন কোর্টের সাপ্লিমেন্টারি কেস হিসাবে বিশেষ মামলা দায়ের করা হল | ওই আদালতের এইনুদ্দিন নামে একজন ম্যাজিস্ট্রেট আসফাক উল্লাহ খানকে তার পক্ষ সমর্থনের জন্যে কোনো মুসলিম উকিলকে নিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন | কিন্তু আসফাক সেই প্রস্তাব নাকচ করে একজন হিন্দু কৃপাশঙ্কর হাজেলাকে নিজের উকিল হিসাবে বেছে নেন | মামলা চলার সময় আসফাককে প্রভাবিত করার জন্যে এবার ব্রিটিশ সরকার হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক তাস খেলারও চেষ্টা করেছিল | তাই জেলের ভিতরে একদিন রাত্রে সি আই ডি ইন্সপেক্টর তসদ্দুক হোসেন দেখা করতে এলেন আসফাকের সাথে | ফাঁসির সাজার হাত থেকে বাঁচার জন্যে তিনি আসফাককে রাজসাক্ষী হওয়ার পরামর্শ দিলেন | সেই প্রস্তাবে আমল না দেওয়ায় তসদ্দুক হোসেন আসফাককে বলেছিলেন যাদের সাথে তুমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে লড়ছো তারা সবাই হিন্দু | রামপ্রসাদ বিসমিলের মতো একটা কাফেরের নেতৃত্বে যদি দেশ কখনও স্বাধীনও হয়, সেখানে হিন্দু রাষ্ট্র কায়েম হবে | সেখানে মুসলিমদের কোনো জায়গা থাকবে না | এর উত্তরে আসফাকুল্লা খান উর্দুতে যে ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন তার উল্লেখ আছে নানা বইতে | বাংলা তর্জমায় সেটা ছিল “হোসেন সাহেব, পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলকে আমি আপনার থেকে অনেক বেশি চিনি | তার কাছে স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্নটা অন্যরকম | আর আপনার কথা মতো যদি কোনোদিন ভারত হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবেও স্বাধীন হয় তবুও সেটা আমাদের মুসলমানদের কাছে ইংরেজ শাসনের থেকে কয়েক হাজার গুন ভালো হবে | আর যেহেতু আপনি পণ্ডিতজীকে কাফের বলেছেন তাই আপনাকে অনুরোধ করছি এই মুহূর্তে আমার কুঠুরি থেকে বেরিয়ে যান | আজ পর্যন্ত আমার হাতে কোনো মানুষের রক্ত লাগেনি | কিন্তু আপনি এখান থেকে না গেলে আমার বিরুদ্ধে সরকারকে আই পি সি ৩০২ ধারাতেও আরেকটা মামলা রুজু করতে হবে |”

অবশেষে ১৯২৭ সালের ৬-ই এপ্রিল ঐতিহাসিক কাকরী ষড়যন্ত্রের প্রথম সেশন কোর্টের মামলার রায় ঘোষণা করলেন বিচারপতি হ্যামিলটন | ইতিহাস প্রসিদ্ধ সেই ‘কিং এম্পারার ভার্সেস রাম প্রসাদ বিসমিল এন্ড আদার্স’ মামলার ১১৫ পৃষ্ঠার সেই রায়ে পণ্ডিত রামপ্রসাদ মিসমিল, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী আর ঠাকুর রোশন সিংহের ফাঁসির আদেশ শোনানো হলো | মন্মথ নাথ গুপ্ত নাবালক ছিলেন বলে ওনাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ১৪ বছরের জন্যে কারাবাসের সাজা দেওয়া হয় | বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালকে আন্দামানের সেলুলার জেলে আজীবন কারাবাসে দণ্ডিত করা হল | ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শচীন্দ্রনাথ সান্যাল ছিলেন এমন এক বিপ্লবী যিনি দুবার আন্দামানে বন্দী ছিলেন | এছাড়া যোগেশ চন্দ্র চ্যাটার্জী, মুকুন্দী লাল, গোবিন্দ চরণ কর, রাজকুমার সিংহ আর রামকৃষ্ণ ক্ষত্রীর দশ বছরের সশ্রম কারাবাসের সাজা হয় | বিষ্ণুচরণ দুবলিশ, সুরেশ চন্দ্র ভট্টাচার্যর সাত বছর, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল, প্রেমকৃষ্ণ শর্মার পাঁচ বছর, বনওয়ারী লাল, প্রনবেশ কুমার চ্যাটার্জির চার বছর মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হল | প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য পাবলিক প্রসিকিউটার হিসাবে জগৎ নারায়ণ মুল্লা রামপ্রসাদ আর বাকি দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন | কাকরী ট্রেন ডাকাতির সময় দ্বিতীয় শ্রেণীর যে কামরায় রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী চেন টেনে ছুটন্ত ট্রেন থামিয়েছিলেন তার বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সহযাত্রী মোকদ্দমা চলাকালীন আদালতে এসে ওনাকে শনাক্ত করেছিলেন | তাই রাষ্ট্রদ্রোহীতায় প্রত্যক্ষ সহযোগিতার জন্যে ওনাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে সরকার তরফের আইনজীবী জগৎ নারায়ণ মুল্লা চেষ্টার কোনো খামতি রাখেন নি |

পাবলিক প্রসিকিউটর জগৎ নারায়ণ মুল্লা প্রায়ই পণ্ডিত রামপ্রসাদের সামনে ইংরেজিতে সওয়াল জবাবের সময় ঘাবড়ে যেতেন । শোনা যায় একদিন এইরকম পরিস্থিতিতে পড়ে আদালতের পিছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিয়েছিলেন । এমনিতে জগৎ নারায়ণ মুল্লা নিজেও একজন শায়র ছিলেন | তাই আদালতে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সাথে মাঝে মধ্যে উর্দু শায়েরির মাধ্যমেও সওয়াল জবাব চলতো | তবে বলা বাহুল্য বিসমিল বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জগৎ নারায়ণকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়তেন | এরকমই একটা দিনের কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে । একবার জগৎ নারায়ণ আসামিদের উর্দুতে ‘মুলজিমান’ অর্থাৎ ‘অপরাধীরা’ বলে সম্বোধন করতে গিয়ে থতমত খেয়ে ‘মুলাজিম’ মানে ‘চাকর’ বলে ফেলেন । সরকারি উকিলের মুখে ‘মুলাজিম’ শুনে সহাস্য বিসমিলের তাৎক্ষণিক উত্তর ছিল:

“মুলাজিম হমকো মত কহিয়ে, বড়া অফসোস হোতা হ্যায়,
অদালত কে অদব সে হম ইয়াহাঁ তশরীফ লায়ে হ্যায় |
পলট দেতে হ্যায় হম মৌজে-হবাদিস অপনী জুর্রত সে,
কি হমনে আঁধিয়ো মেঁ ভী চিরাগ অকসর জলায়ে হ্যায়|”

অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন ‘মুলাজিম’ আমরা নই বরং মুল্লাজীই চাকর, কারন তিনি সরকারের বেতনভুক কর্মচারী । আমরা তো রাজনৈতিক বন্দী, তাই আমাদের সন্মান দিয়ে কথা বলুন । যেখানে আমরা সমুদ্রের ভয়ংকর ঢেউকেও দুঃসাহসে শান্ত করতে পারি, ঝড়েও বারবার প্রদীপের আলো জ্বালাতে পারি, সেখানে আদালতের আইনি লড়াইতে পাশা পাল্টে দেওয়া কি এমন বড়ো কথা ।

অবশ্য ঘটনা এখানেই শেষ নয় | এখনো বেশ কিছুটাই বাকি | প্রথম সেশন কোর্টের রায় বেরিয়েছিল ১৯২৭ সালের ৬-ই এপ্রিল | আগের সেশন কোর্টের মতোই সাপ্লিমেন্টারি সেশন কোর্টেও বিচারের নামে প্রহসনের সেই একতরফা ট্রাডিশনকে বজায় রেখে ১৯২৭ সালের ১৩-ই জুলাই ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর রাজদ্রোহীতার অভিযোগে আসফাক আর শচীন্দ্রনাথ বক্সীকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারপতি তার রায় ঘোষণা করলেন । আই পি সি ১২০ (বি) আর ১২১ (এ) ধারায় শচীন্দ্রনাথ বক্সীর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড আর তার সাথে অতিরিক্ত ৩৯৬ ধারা যোগ করে আসফাক উল্লাহ খানকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হল । বিচারপতি তার রায়ে একথাও উল্লেখ করেছিলেন যে যেহেতু ব্যক্তিগত কোনো লাভের জন্যে আসামিরা এই ষড়যন্ত্রের শরিক ছিলেন না তাই যদি তারা তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুশোচনা প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তবে উচ্চতর আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে ।

দু দফায় মোট তেরো মাস ধরে লখনৌর রিং থিয়েটারে চলেছিল এই মামলা ।কাকোরী ট্রেন ডাকাতিতে মোট ৮ হাজার ৩০০ টাকার মতো অর্থ লুণ্ঠন হলেও এই মামলায় সরকারের তরফে খরচ হয়েছিল ১৩ লক্ষের বেশি টাকা । সরকার পক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসাবে জগৎ নারায়ণ মুল্লা এক লক্ষ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন | প্রথমদিকে বেশিরভাগ সাধারন মানুষ কাকোরী ট্রেন ডাকাতির ঘটনাটাকে অন্য পাঁচটা লুঠতরাজের ঘটনা ভাবলেও যত মামলা এগোতে লাগলো ততই সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকলো বিপ্লবীদের অসামসাহসিক সেই কর্মকান্ডের তাৎপর্য | ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাকোরী কান্ডে অভিযুক্তদের মুক্তির দাবিতে স্বতঃস্ফূর্ত মিটিং মিছিল সংগঠিত হতে থাকে | ভারতবর্ষের প্রতিটা প্রান্তে দলমত নির্বিশেষে বিক্ষোভ কর্মসূচি নেওয়া হয় |

  ফাঁসির আদেশ শুনে উল্লাস হাসতে হাসতে পাশে দাঁড়ানো বিভূতি সরকারের গায়ে চিমটি কেটে বলল "যাক,বাঁচা গেল"
কাকরী ট্রেন ডাকাতির অভিযুক্ত বিচারাধীন বন্দী হিসাবে সবাইকে প্রথমদিকে রাখা হয়েছিল লখনৌ সেন্ট্রাল জেলে । যে কোনো মূল্যে ব্রিটিশ সরকার তাদের ফাঁসিতে লটকাবেই এটা রামপ্রসাদ বিসমিল খুব ভালোই বুঝতে পারছিলেন । তাই খুব গোপনে লখনৌ জেল থেকে কয়েকজন সাথীকে নিয়ে বিসমিল পালানোর একটা প্ল্যান তৈরী করেছিলেন। কিন্তু এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে গেলে বাইরে থেকে সাহায্য প্রয়োজন । মহাবিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু কোনোভাবে এই খবর যুক্তপ্রদেশ পুলিশের গোয়েন্দারা জেনে ফেলে । তাই সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করা যায়নি ।

তাই সাজা ঘোষণার পর আর ব্রিটিশ সরকার চার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা-প্রাপ্ত বন্দীকে একসাথে একই জেলে রাখার সাহস পেল না । পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলকে পাঠানো হলো গোরখপুর জেলে । একই সময় আসফাক উল্লাহ খানকে ফৈজাবাদ, ঠাকুর রোশন সিংহকে নৈনী আর রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়িকে গোন্ডা জেলে স্থানান্তরিত করা হয় । কাকোরী কান্ডে সাজাপ্রাপ্ত অন্যান্য বন্দীদেরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হলো যুক্তপ্রদেশের বেরেলি, রায়বারেলি, আগ্রা, ফতেগরের মতো বিভিন্ন জেলে |

আইনজীবীর পরামর্শে আসফাক উল্লাহ খান ফৈজাবাদ জেলে গিয়ে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিলের সাথে আলোচনায় বসলেন । বিসমিল এখানে আসফাক উল্লাহ খানকে একটা খুব দামি কথা বলেছিলেন | দাবা খেলায় প্রতিপক্ষকে বাজিমাত করতে গেলে কখনো কখনো কয়েক ঘর পিছনের দিকেও চাল দিতে হয় | ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যুবরণ করলে তো সব শেষ । বরং কোনোভাবে মৃত্যুদণ্ড এড়িয়ে সেটাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে পরিবর্তিত করতে পারলে বছর সাতেক বাদে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে । আর তখন আরো বেশি শক্তি সঞ্চয় করে পূর্ণোদ্যমে ব্রিটিশ সরকারকে সমূলে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে । অনেক আলাপ আলোচনার পর আসফাক উল্লাহ খান বিসমিলের প্রস্তাবে রাজি হলেন ।

১৯২৭ সালের ১১-ই আগস্ট প্রথমবার আর ২১-শে আগস্ট দ্বিতীয়বার চিফ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পণ্ডিত রামপ্রসাদ বিসমিল, আসফাকুল্লা খান আর ঠাকুর রোশন সিংহ মার্সি পিটিশন দাখিল করেন । এদিকে আসফাকুল্লা খানের আইনজীবীর পরামর্শে তাঁর মা মাজহুর-উন-নিসার বেগম আলাদা ভাবে ভাইসরয় তথা গভর্নর জেনারেলের কাছে মৃত্যুদণ্ড মকুবের জন্যে লিখিত আর্জি জানান । কিন্তু যথারীতি কোনো আবেদনেরই কোনো উত্তর এলো না ।

এখানে একটা কথা আলাদা ভাবে উল্লেখ করতেই হবে যে রাজেন্দ্র নাথ লাহিড়ী কিন্তু কোনোরকম প্রাণভিক্ষার আবেদন করেননি । সম্পূর্ণ বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকম শান্ত । বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁর কোনো কৌতূহল ছিল না । এমনকি আদালতের রায় ঘোষণা সম্পর্কে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড ভাবে উদাসীন ।

 এদিকে মার্সি পিটিশনের কোনো জবাব না আসায় সারা দেশের মানুষজন বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অনৈতিক মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল অব্যাহত রইল | একটা ডাকাতি আর তাতে একটা অনিচ্ছাকৃত মৃত্যুর ঘটনা | তার জন্যে চারজনের ফাঁসি ! সারা দেশ তখন উত্তাল | চাপে পড়ে দলমত নির্বিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অনুরোধ জানিয়ে যুক্তপ্রদেশের বিধানসভার সবার স্বাক্ষরিত একটা মেমোরেন্ডাম নৈনিতালে পাঠানো হল যুক্তপ্রদেশের তৎকালীন গভর্নর উইলিয়াম মরিসের কাছে | এর সাথেই পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ আর সি ওয়াই চিন্তামণি চার অভিযুক্তের প্রাণভিক্ষার আবেদন জানিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে গভর্নরের কাছে আবেদন পত্র পাঠান | এসবের জবাবে ১৯২৭ সালের ২২-শে সেপ্টেম্বর হোম সেক্রেটারি এইচ ডব্লিউ হেগ ফাইনাল রিপোর্টে পরিষ্কার জানালেন যে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভাবে প্রমাণিত | এদের কার্যকলাপ দ্বারা এটা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য যে এদের উদ্দেশ্য একটা স্থাপিত সরকারের বিলয় সাধন করা | তাই যদি এদের চারজনকে ফাঁসির মতো কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়া হয় তবে শুধু বাংলায় আর যুক্তপ্রদেশে কেন, সমস্ত ভারতবর্ষেই অচিরে এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে | আর তাই ফাঁসি হয়ে যায় ওই চার বিপ্লবীর |

আসফাকের মৃতদেহ জানাজায় চাপিয়ে গাড়িতে করে ফৈজাবাদ জেলের গেট থেকে প্রায় তিনশো কিলোমিটার দূরে শাহজাহানপুরে তার পৈতৃক বাড়িতে আনা হয় | বয়স জাতি ধৰ্ম নির্বিশেষে প্রায় দুহাজার মানুষ তখন সেখানে শহীদ আসফাক উল্লাহ খানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত | কানপুর থেকে অসুস্থ শরীরে সেই সময়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও প্রখ্যাত পত্রকার শ্রী গনেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী এসেছিলেন | বাড়ির সামনের বাগিচায় মুসলিম রীতি মেনে আসফাক উল্লাহ খান-এর মরদেহ সমাধিস্থ করা হলো | আসফাক বিরাট মাপের উর্দু আর হিন্দী ভাষার কবি ছিলেন | সমাধির গায়ে শ্বেতপাথরে খোদাই করা তাঁরই লেখা দুটো লাইন উৎকীর্ণ করা আছে |

জীবনের প্রতিশ্রুতি তোমার মরণেই পূর্ণ হবে,
মৃত্যুতেই তোমার জীবনের কাহিনী সম্পূর্ণতা খুঁজে পাবে |

এই অবসরে একটা তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই | ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত অমর শহীদ ‘আসফাক উল্লাহ খান ওয়ার্সি হসরত’ হলেন একমাত্র মুসলিম বিপ্লবী যিনি ফাঁসির মঞ্চে নিজের জীবন বলিদান দিয়েছিলেন |

আসফাক উল্লাহ খান এর ফাঁসির পর ব্রিটিশ সরকার ওই পরিবারের সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে | তাঁর পিতার চাকরি, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সব কেড়ে নেওয়া হল | রাতারাতি একটা ধনী পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে | আসফাক উল্লাহ খানের মা ওনার নিজের উদ্যোগে বেশ কিছুদিন লড়াই করার পর ব্রিটিশ প্রশাসনে উচ্চপদে কর্মরত কয়েকজন আত্মীয়দের প্রভাব খাটিয়ে তার কিছুটা পুনরুদ্ধার করে নিজেদের পরিবারের কোনোরকমে গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন | বর্তমানে সেই বীর মুসলিম শহীদের নামে শাহজাহানপুরের যে অঞ্চলে তিনি জন্মেছিলেন তার নামাঙ্কিত আসফাক উল্লাহ খান নগরে ওনার পৈতৃক গৃহের চৌহদ্দির মধ্যে আসফাক উল্লাহ খানের জরাজীর্ণ সমাধিতে ওনার জন্মদিনে আর দেশের তথাকথিত স্বাধীনতা দিবস মানে ১৫-ই আগস্ট স্থানীয় কিছু মানুষজন ফুল দিয়ে আসেন | আসফাক উল্লাহ খানের দাদা রিয়াসতের দিক থেকে ওনার দুই নাতি বড়ো শাহাদাবুল্লাহ খান আর ছোট জনের নাম তাঁর বিখ্যাত পিতামহের নামেই রাখা আশফাকুল্লাহ খান, সেই ভিটেতেই আছেন | শাহাদাবুল্লাহ সবে গ্রাজুয়েশন শেষ করে এম এ ক্লাসের স্টুডেন্ট | ছোটজন কলেজে পড়ছেন | স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ বছর কেটে গেলেও কেন্দ্র আর রাজ্যের বিভিন্ন সরকারের কাছে তাদের পরিবার বহু আবেদন নিবেদন করা সত্বেও ওনার সমাধি ক্ষেত্রের সংস্কার বা সৌন্দর্যায়নের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি | তবুও নিজেদের উদ্যোগে ওনারা খানিকটা সংস্কার করে কোনোরকমে সেই অমর স্মৃতিচিহ্ন টিকিয়ে রেখেছেন |

কেউ মনে রাখেনি….কেউ মনে রাখে না !

-আনন্দ চট্টোপাধ্যায়

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com
⏳ নিউজ লোড হচ্ছে...