প্রাক্তন সংখ্যালঘু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার-এর প্রস্তাব বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নিকট





রাজ্যে সম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দাঙ্গা রোধ ও প্রশমনে আইন প্রণয়ন সম্পর্কিত প্রাক্তন সংখ্যালঘু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার-এর প্রস্তাব বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নিকট। ড. সাত্তার তাঁর ফেসবুকে তিনি নিয়মিত প্রস্তাব রাখছেন এবং নিজের ওয়ালে কলম ধরেছেন। পাঠকের এবং তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের নিকট আন্তরিক অনুরোধ সহ তিনটি প্রস্তাব তুলে ধরার প্রয়াস।

২০২১-এর নির্বাচনোত্তর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশন জুলাই ০২ তারিখে শুরু হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, বাজেট অনুমোদনের বাইরে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদ গঠন করে কিছু কিছু পছন্দসই ব্যক্তিকে পুনর্বাসন দেওয়াই নাকি সকারের মুখ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছি------

ধুলাগড়, হাজিনগর, বাদুড়িয়া তেলেনিপারা এবং রামনবমীকে কেন্দ্র করে আসানসোল-রানিগঞ্জ-কাকিনারা-টিটাগর সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় অস্ত্রধারীদের যে উন্মত্ততা ও তাণ্ডব রাজ্যবাসী দেখেছিলেন তাতে মনের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ, শিহরন বয়ে গিয়েছিল। 

রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী দেশভক্তদের অস্থির পদচারনার মধ্যে দিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করার এক ছদ্মবেশী আহ্বান আছে। বিদ্বেষকেও তারা পুজোর অঙ্গ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক আহ্বানে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষিত, সংস্কৃতি প্রেমীরাও নানা ভাবে জেনে না জেনে আক্রান্ত হচ্ছেন! পরিণতিতে  কি বিদ্বেষ সর্বগ্রাসী হচ্ছে না?  তাই কি ছোটো ছোটোদের হাতে শিশুপাঠ্য বই নয়, আমদানি করা খাপ খোলা তলোয়ার হয়ে উঠে এই বিদ্বেষের প্রতীক, সমর চিত্র?  সুকুমারমতি এই সমস্ত কচিকাঁচাদের কী কারণে  রণসাজে সজ্জিত করা হচ্ছে? ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা একটি বিশেষ দলের নেতারাই বা কেন অস্ত্র প্রদর্শনে মরিয়া হয়ে যাচ্ছেন?

উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এই পরম্পরা 'আমরা--ওরা'র নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতির এই বিনির্মাণে সব থেকে বিপন্ন হয়েছে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসনের মতো ভারতীয় সংবিধানের মূল স্তম্ভগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব, পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ।
উপরিউক্ত এই ভাবনা থেকেই  কংগ্রেস সরকার রাজ্যসভায় পেশ করেছিল ' The Communal Violence (Prevention, Control and Rehabilitation of Victims) Bill 2005'। আরএসএস-বিজেপির প্রবল বিরোধিতায় বিলটি পাশ হয়নি। আবারও পরিমার্জন করে ' The Prevention of Communal Violence (Access to Justice and Repararations) Bill 2013' -এরও একই অবস্থা হলো!

এখন প্রশ্ন হলো , পশ্চিমবঙ্গের মতো আপাত শান্তির মরুদ্যানকেও কি কিছু কিছু শক্তি সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ছোবলে গ্রাস করতে চাইছে না? ভুলে গেলে চলবে না- পরাজিত হলেও প্রধান শক্তিরূপে হাজির হয়েছে। 
সংবাদমাধ্যমের একাংশের খবর অনুযায়ী 'চানক্য'-এর দলে যোগদান উপলক্ষে এই কিছুদিন আগেও শোনা গেলো--একটি বিশেষ মহল থেকে পশ্চিমবঙ্গে নাকি  সম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা ঘটেছে তাতে কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই  রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব ----
এই  গুরুত্বপূর্ণ বিলটি কি  আপনি এই বিধানসভা অধিবেশনে উত্থাপন ও পাশ করানোর কথা ভাবতে পারেন না ?

প্রস্তাব দুই
--------------
সম সুযোগ কমিশন (Equal Opportunity Commission) আইন প্রণয়ন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইন প্রণয়ন বিধানসভার অন্যতম মুখ্য বিষয়। তাই কেন ও কী কারণে এই আইন প্রণয়ন---

নির্বাচনোত্তর সাম্প্রতিক দুটি বিষয়ের প্রতি নজর দিলেই বিষয়টি বুঝতে পারবেন--
এক . সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সব থেকে কম মুসলিম বিধায়ক। এমন-- কী ১৯৬৭ সালেও ৩৭ জন বিধায়ক ছিলেন।
দুই. মহিলাদের জন্য  প্রতিমাসে পকেট মানি'র প্রকল্প চালু করা। এই প্রকল্পে তপশিল জাতি ও তপশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের মহিলাদের প্রতিমাসে এক হাজার টাকা দেওয়া হবে।  এর সঙ্গে মুসলিম ও অন্যান্য ওবিসিদের যুক্ত করলে কি আরও ভালো হতো না?এখনও সময় আছে।  সরকারের সদিচ্ছা থাকলে করতেই পারে। আবার, সাধারণ পরিবারের জন্য পাঁচশো টাকার কথা বলা হয়েছে। এই সাধারণের মধ্যে মুসলিম ও  অনান্য ওবিসিরাও পড়েন। তারাও পাঁচশো টাকা পাবেন! আবারও কি সেই উন্নয়ন-- ঘাটতি?

সচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিবঙ্গে সেই সময়ে বিরোধী দল যে আলোড়ন তুলেছিল, তা সকলেই জানেন। অবশ্য, সরকারে এসে এই বিষয়ে আর কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। ২০১৯-এর পর থেকে তো তথৈবচ! মুসলিম- তোষণের ভয়ে নাকি ভীত, সন্ত্রস্ত!
 সাচার কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উন্নয়নের  কোনও কোনও মানদণ্ডে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তপশীলি জাতির মানুষের থেকেও পিছিয়ে রয়েছেন। 
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর নিশ্চয়ই মনে আছে, সাচার কমিটির প্রতিবেদনের পরে কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার অমিতাভ কুন্ডু- এর নেতৃত্বে Equal Opportunity Commission গঠন করেন। দুঃখের হলেও সত্য, প্রতিবেদন জমা পড়লেও বাস্তবায়ন আর হলো না। 
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই আইনের সঙ্গে প্রচলিত সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে গুলিয়ে ফেলবেন না। সংরক্ষণ যেভাবে আছে, সেইভাবেই থাকবে।

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এই আইন প্রণয়ন করলে  ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সরকার প্রদত্ত  যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা  সকলেরই সমভাবে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দীর্ঘকালের সযত্ন লালিত বঞ্চনার ধারণার কিছুটা হলেও অবসান হবে। সর্বোপরি 'মুসলিম-তোষণ' বাণী থেকেও রেহাই পাবেন।   আবহমানকাল ধরে সমাজে শ্রেণি বৈষম্য আছে, একদিনে তার অবসান হবে না। তবু, তা দূর করার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী ভাবনার প্রয়োজন। 
তাই  প্রস্তাব----  এই বাজেট অধিবেশনে এই আইন কি উত্থাপন ও পাশ করার কথা সরকার ভাবতে পারেন না? যদি পারেন তাহলে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সারাদেশে আপনার অগ্রণী ভূমিকা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।


প্রস্তাব তিন
------------------
রাজ্যে ওয়াকফ কর্পোরেশন গঠন।

স্বাধীনতার পর ভারতে বহুল চর্চিত ও বিতর্কিত বিষয় হলো ওয়াকফ সম্পত্তির  পুনরুদ্ধার, রক্ষণাবেক্ষণ সর্বোপরি উন্নয়ন। এই বিষয়ে সাচার কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্তরে ওয়াকফ কাউন্সিল 'ওয়াকফ উন্নয়ন কর্পোরেশন' গঠন করে কংগ্রেস সরকার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। ওয়াকফ সম্পত্তির উন্নয়ন করে যাতে সংখ্যালঘু ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান, বাসস্থান সহ প্রয়োজনীয় কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। আমাদের রাজ্যেও বহু সম্পত্তি আছে, যেখানে উন্নয়নের সুযোগ আছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে শুধুমাত্র  কলকাতা শহরেই এই ধরণের ১৪ টি সম্পত্তি চিহ্নিত করে এসেছিলাম। সেই সমস্ত সম্পত্তির উন্নয়ন করে কর্মসংস্থান, আবাসনের সমস্যা মেটানোর মতো বহু  কাজ করা যায়। এই সংক্রান্ত যাবতীয় নথি ওয়াকফ বোর্ডে সংরক্ষিত থাকার কথা।
অবশ্য বিগত দশ বছরে তৃণমূল সরকারের সব কিছু বিরোধিতা করার মতো ধ্বংসাত্মক কোনও বিরোধী দল ছিল না। 

সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এখনও তো করা সম্ভব। সকলের সদিচ্ছায় এই কাজগুলো করাই যায়। কিন্তু বিগত দশ বছরে সেই শুভ রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন রাজ্যের মানুষ দেখতে পান নি। এতদসত্বেও আশা করব, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এই বাজেট অধিবেশনেই ওয়াকফ কর্পোরেশন-এর মতো গুরুত্বপুর্ণ বিল উত্থাপন ও পাশ হবে।

 আবার যদি মনে করেন মুসলমান-মুসলমান বেশি করলে বিজেপি আরও বেড়ে যাবে, তাহলে তো আর কিছুই হবে না।
এখন প্রশ্ন হলো, বিজেপি বাড়তে কি আর বাকি আছে?

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com
⏳ নিউজ লোড হচ্ছে...