অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, হাওড়া
সময়টা ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের পয়লা জানুয়ারী। এই দিনটিতেই ভক্তদের জন্য মনোবাঞ্চা কল্পতরু হয়েছিলেন ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এই বিশেষ দিনটি পালিত হয় কল্পতরু উৎসব হিসাবে। হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার দক্ষিণ গঙ্গারামপুরে শক্তি সংঘের দুর্গা মন্দিরে পালন করা হলো এই কল্পতরু উৎসব।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে রায়নদেব হালদার জানান, "প্রতিবছরই আমরা এই কল্পতরু উৎসব পালন করে থাকি। এবছর করোনা আবহে এই বিশেষ দিনটি পালন করতে পেরে আরো ভালো লাগছে।
শক্তি সংঘের সম্পাদক বিশ্বজিৎ হালদার বলেন, "কল্পতরু সম্পর্কে পুরাণে বলা আছে, এ এক আশ্চর্য গাছ যার কাছে নাকি যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়।, আমাদের এই বছরের চাওয়া পৃথিবী যেন করোনা মুক্ত হয়"।
আসলে 'কল্পতরু’ কথাটি এসেছে পুরাণ থেকে। এটি হল কল্পান্তস্থায়ী বৃক্ষ। দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনের কথা কম বেশি আমরা সকলেই জানি। দেবাসুরের সমুদ্রমন্থনের সময় সমুদ্রগর্ভ থেকে এটি উত্থিত হয়।পরে কল্প শেষ হলে আবার সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়। এই জন্যই এর নাম হয়েছে কল্পতরু।এটি হল অভীষ্ট ফলদায়ক বৃক্ষ।এই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কোনও কিছু জিনিস প্রার্থনা করলে তা অচিরেই লাভ হয়। পুরাণ মতে, দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গোদ্যানে নাকি এই গাছ ছিল এবং এই গাছের কাছে যে যা চাইতো তাই পেত। এটি ইন্দ্রলোকের সর্বকামনা-পূরণকারী দেবতরু। সেই গাছ নিয়েই একটি গল্প আছে। পথশ্রমে ক্লান্ত এক ব্যক্তি একটি গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালেন। গাছটি যে কল্পতরু তা তিনি জানতেন না। হঠাৎ তিনি ভাবলেন, ‘‘খুব তেষ্টা পেয়েছে, একটু যদি জল পেতাম তো খুব ভাল হত।’’ ও বাবা, ভাবনা শেষ হতে না হতেই নানা রকম জল এসে হাজির। এ বার তার মনে হল, ‘‘একটু খাবার পেলে বেশ ভাল হত।’’ অমনি সুস্বাদু সব খাবার উপস্থিত।
বিশ্রামের কথা ভাবতেই অমনি প্রস্তুত সুরম্য বিশ্রামাগার। এ বার তিনি ভাবলেন, ‘‘যদি কেউ একটু পা টিপে দিত, ঘুমটি বেশ ভাল হত।’’ এক সুন্দরী মহিলা অমনি উপস্থিত। হঠাৎ তাঁর মনে হল, ‘‘এত সুখ আমার কপালে সইবে তো? হঠাৎ যদি বাঘ এসে হাজির হয়!’’ ভাবা মাত্র বাঘ এসে হাজির হয়ে লোকটিকে খেয়ে ফেলল।
এই রূপক গল্পটির অন্তরালে যে রূপটি রয়েছে তা হল, চাইতে জানতে হয়। কল্পতরু কল্পনারই গাছ। কিন্তু সে যদি বাস্তব হত তবে কী চাইতাম তার কাছে? আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আকাঙ্ক্ষা তো পরিপূর্ণ তৃপ্তি দেয় না কোনও দিনই। চাইতে হবে সেই সত্যের খোঁজ যা চিরকালীন, যা অনন্তস্পর্শী।কল্পতরুর সঙ্গে ভগবানের স্বভাবের তুলনা করা হয়।
স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেব অনেকবার নিজেই ভক্তদের বলেছেন, “ভগবান কল্পতরু। কল্পতরুর নীচে বসে যে যা চাইবে, তাই পাবে। তবে শ্রীরামকৃষ্ণদেব এও বলেছেন যখন সাধন-ভজনের দ্বারা মন শুদ্ধ হয় তখন খুব সাবধানে কামনা করতে হয়। কারণ কল্পতরু বৃক্ষের নীচে প্রার্থনা করলে ভালো-মন্দ যা সব চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়।
আজ থেকে এত বছর আগে শ্রীরামকৃষ্ণ এই দিনে আমাদের চৈতন্যের উন্মেষের কথা বলেছিলেন। আজ সমকালের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আজ এই চৈতন্যেরই একান্ত প্রয়োজন যার অভাবে সমস্ত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমরা ছুটে চলেছি এক অসীম অভাবের দিকে, আসন্ন ধ্বংসের দিকে।



