নিজস্ব সংবাদদাতা, হাওড়া:
ঘৃণা, বিদ্বেষকে সরিয়ে ভালোবাসার ভুবন গড়ার আওয়াজ উঠলো বসন্ত উৎসবে। রাজীবপুর অগ্রণী পাঠাগারের উদ্যোগে ২য় বর্ষ বসন্ত উৎসবে বিভেদ ও বিভাজনের জাল ছিন্ন করে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করার শপথ উচ্চারিত হল।
শান্তিনিকেতনের আদলে গ্রন্থাগার প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় বসন্ত উৎসব।
গ্রন্থাগারের শিশু ও কিশোর বিভাগের পাঠকরা পলাশ ফুল ও কামিনী ফুলগাছ দিয়ে মাঠ সাজান। রঙ বেরঙের কাগজের পাতা দিয়ে উৎসবের চেন ফ্ল্যাগ লাগানো হয়। গ্রামের মহিলারা রাত জেগে গোটা গ্রামের পথ আল্পনা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন।
গান, কবিতা ও নৃত্যের ডালির সঙ্গে ছিল ক্যানভাসে তুলির টানে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ।
গৃহবধূ বুল্টি বেরাদের সঙ্গে আল্পনা দিয়ে গ্রামের পথ সাজিয়ে তোলে সামৃতা সাঁতরা, অঙ্কিতা সাহুরা। আবার গ্রন্থাগার প্রাঙ্গন পলাশের ডাল , বসন্তকালের প্রতীক রঙ বেরঙের কাগজ দিয়ে তৈরি চেন ফ্ল্যাগ দিয়ে সাজিয়ে তোলে অবনীশ প্রামাণিক, শান্তনু দে'র মত স্কুল পড়ুয়ারা।
কোনো এক বসন্তের শান্তিনিকেতন। বসন্ত উৎসব দেখার অভিজ্ঞতা চাক্ষুষ যাদের হয়েছে। তারা দেখেছিলেন খোলা মাঠে প্রকৃতির মাঝে। ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে বসন্ত উৎসবের বর্ণময় ছটা।
সেই যৌলুস না থাকলেও শহর থেকে অনেক দূরে। এক অজানা গ্রামে ঠিক যেন শান্তিনিকেতন এসে পড়েছে। এমনটাই বলেছেন অনেকে। গৃহবধূ বুল্টি বেরা জানালেন, আমি গ্রন্থাগারের উদ্যোগের কথা গ্রন্থাগারিকের কাছ থেকে জানতে পারি। ভালো লাগছে গ্রন্থাগারিক উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সামনে শান্তিনিকেতনের মত বসন্ত উৎসব উপহার দিলেন।
এবছর শান্তিনিকেতনে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু, বসন্ত উৎসব ওখানে বাতিল হওয়ায় আর যাওয়া হয় নি। তবে আরেক শান্তিনিকেতন আমরা পেলাম। খুব গর্ব হচ্ছে রাজীবপুর অগ্রণী পাঠাগারের উদ্যোগের জন্য।
প্রকৃতির রূপ, গন্ধ, বর্ণের স্বপ্নিল রঙে রাঙা বসন্তকে বরণ করতে ভালোবাসার উদ্যোগ। ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দিতে প্রচেষ্টা। চারিদিকে যখন রং দিয়ে বিভাজনের অপচেষ্টা, তখন একে অপরকে বসন্তের রঙে রাঙিয়ে সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রাখার দৃঢ় প্রত্যয়ের শপথের নাম বসন্ত উৎসব।
প্রকৃতি বাধ সেজেছিল। রাজীবপুর গ্রামে গ্রামেরই গ্রন্থাগারের উদ্যোগে বসন্ত উৎসবের আয়োজন প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই সম। শুক্রবার বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রামের মহিলারা গ্রন্থাগারের পাঠকদের সঙ্গে গ্রাম্য রাস্তা আল্পনা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। প্রকৃতির দুর্যোগ ও ভরাবৃষ্টি সব কিছু ধুইয়ে দেয় নিমেষে। শনিবার সকালেও ছিল মেঘলা। বসন্ত উৎসব হবে কিনা ছিল সংশয়। কিন্তু বন্ধন দৃঢ় হওয়ার কারণে সংশয়ের মেঘকে সরিয়ে দিয়ে ফের শুরু হয় প্রস্তুতি। কিশোর বিভাগের পড়ুয়ারা পলাশ ফুল, বসন্তের প্রতীক সম্বলিত গাছ সাজিয়ে তোলে। গ্রন্থাগার মাঠ পেরিয়ে গ্রন্থাগারে ঢোকার প্রবেশ পথে আল্পনা দিয়ে বসন্তের আহ্বান আঁকা হয়।
রাজীবপুর অগ্রণী পাঠাগারের উদ্যোগে ২য় বর্ষ বসন্ত উৎসব ঠিক যেন মিনি শান্তিনিকেতন। খোলা মাঠে এক প্রান্তে নৃত্য, কবিতা ও সঙ্গীতের সুর ঝংকার।
আরেক প্রান্তে ক্যানভাসে তুলির টানে ভালোবাসার জলছবি ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা।
রাজীবপুর অগ্রণী পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক শাশ্বত পাড়ুই জানালেন, রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ভাবনাকে পাথেয় করেই গত বছর থেকে বসন্ত উৎসব করছি। এ বছরের বসন্ত উৎসবের ভাবনা ছিল সম্প্রীতির বন্ধন। ঘৃণা, বিদ্বেষের বিষ বাষ্প থেকে স্বদেশকে রক্ষা করতে ভালবাসাকে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি আমরা। এলাকার মানুষ সাদরে আমাদের আবেদন গ্রহণ করে নিজেরাই গ্রন্থাগারের বসন্ত উৎসব সফল করে তোলার কাজ করেছেন। গ্রন্থাগারের পাঠকদের সঙ্গে এলাকার গৃহবধূরা গ্রামের পথে আল্পনা এঁকেছেন।
অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, গীতিনাট্যের সঙ্গে শিল্পীর ক্যানভাসে ভালবাসার বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের ছবি আঁকেন শিল্পীরা। ছোট ছোট শিশুদের হাতের ছাপে ক্যানভাস জুড়ে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন ফুটে ওঠে।
ওরে গৃহবাসী খোল্, দ্বার খোল্.........এই আহ্বানে বসন্তের রঙে রঙে মেতে ওঠেন সকলে। মিনি শান্তিনিকেতনে কবিতা-গান-নৃত্যের সুর ছন্দে প্রকৃতিকে রক্ষার আহ্বানও জানানো হয়।




