পার্থপ্রতিম মুখার্জি,
ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ল ১৯৪৭ সালে | এল ১৯৫১, সংসদে গঠিত হল ভারতের নির্বাচন কমিশন ।
কিন্ত কাকে এর মাথায় বসানো যায় ? বিস্তর আলোচনার পর ঠিক হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চীফ সেক্রেটারিকে নিয়োগ করা হোক এই পদে ।
আপাদমস্তক বঙ্গসন্তান এই মানুষটি প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে অঙ্কে গোল্ড মেডেল পাওয়া স্নাতক,
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পাশ করে পড়তে যান লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গণিতে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন।
ছিলেন ১৯২১ ব্যাচের আইসিএস |
নিয়োগপত্র পাবার একমাস পরেই নেহেরুজী একদিন ডেকে পাঠালেন তাকে ।
বললেন সামনের বছর মার্চ মাসেই দেশ জুড়ে নির্বাচন করাতে হবে, কোন অবস্থাতেই আর দেরী করা যাবেনা !
কাজটা যে কত দুরূহ সেটা নিশ্চয়ই কাউকে বোঝাতে হবে না ।
এতবড়ো একটা দেশ যার পঁচাশি ভাগ মানুষের তখন অক্ষর জ্ঞানটুকুও ছিল না । না ছিল কোন তালিকা না কোন পরিকাঠামো ।
দুঁদে সিভিলিয়ান মানুষটি কিন্ত পিছিয়ে এলেন না । লোকসভা ও বিধানসভা মিলিয়ে প্রথম নির্বাচনে দেশব্যাপী ৪৫০০ আসন ঠিক হয়েছিল, ব্যালট বক্স লেগেছিল ২০ লাখ আর ভোট কেন্দ্র হয়েছিল ২২৪,০০০ টি ।
কিভাবে ভোট দিতে হবে এটা মানুষকে বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ভাষায় ৩০০০ সিনেমা বানানো ছাড়াও আকাশবাণী তিনমাস লাগাতার রেডিও তে বর্ণনা দিয়েছিল ।
কুড়ি লক্ষ ইস্পাতের ব্যালট বাক্স, বানাতে লেগেছে ৮২০০ টন ইস্পাত। ৫৬০০০ প্রিসাইডিং অফিসার, সহায়ক আরও ২৮০০০০ কর্মী।
নির্বাচকদের নাম টাইপ করে নির্বাচনকেন্দ্র অনুযায়ী সাজিয়ে ভোটার লিস্ট তৈরি করার জন্য ছ’মাসের চুক্তিতে নিয়োগ করা হয়েছিল ১৬৫০০ কর্মীকে। ভোটার লিস্ট ছাপতে লেগেছিল ৩,৮০,০০০ রিম কাগজ।
কেন্দ্রীয় বাহিনী তখন তৈরিই হয়নি, অতএব শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভরসা ছিলেন প্রায় সওয়া দু’লাখ পুলিশকর্মী।
সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচন কী সে বিষয়ে কোনও ধারণাই তখনও পর্যন্ত ছিল না নির্বাচকদের।
সবথেকে বিপদে পড়েছিলেন উনি যে কাজটিতে তা হলো ভোটার লিস্ট তৈরী করতে ।
সেসময় গ্রামের দিকে মহিলারা পরপুরুষকে নিজের নাম বলতে চাইতো না , ফলে লিস্ট যখন তার টেবিলে এলো দেখলেন তাতে লেখা রামের মা বা শ্যামের বউ !
রেগে গিয়ে উনি সেবার আটাশ লাখ মহিলার নাম বাদ দিলেন । সমাজতত্ত্ববিদ দের মতে এতে করে তিনি সমাজের উপকারই করেছিলেন কেননা পরের নির্বাচনে এরা সবাই প্রকৃত নাম দিয়ে নিজেদের গণতন্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল ।
প্রথম নির্বাচনে উনি প্রতিটি দলের জন্য পৃথক ব্যালট বাক্সের ব্যাবস্থা করেছিলেন । বাক্সের ওপর প্রার্থীর প্রতীক চিহ্ন সাঁটা থাকতো ।
বাক্স গুলো যত্ন করে রেখে দেওয়ার ফলে ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে বিশাল অঙ্কের খরচ সাশ্রয় হয়েছিল । প্রসঙ্গত সেবারেও তিনি Chief Election Commissioner ছিলেন ।
সাফল্যের সাথে পরপর দুবার এতবড় দেশে নির্বাচন করানোর জন্য রাষ্ট্রসংঘের তরফে তাঁকে সুদানে নির্বাচন পর্যবেক্ষক করে পাঠানো হয় ।
দুঃখের কথা এতবড়ো একটা সাফল্যের পরও ১৮৯৮ সালে বর্ধমানে জন্ম এই বঙ্গসন্তানকে দেশ মনে রাখেনি ।
স্বীকৃতি বলতে শুধু দেশের প্রথম পদ্মবিভূষণ প্রাপক, ব্যাস এইটুকুই ! ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ আফসোস করে বলেছেন, ‘the man who had to make the election possible, a man who is an unsung hero of Indian democracy. It is a pity we know so little about him. He left no memoirs and, it appears, no papers either’. It is sad that a man of such distinct intelligence and integrity has slipped from public memory."
অবিভক্ত বাংলার বর্ধমানে শৈশব, কৈশোর কেটেছে এই বিস্মৃত বাঙালির।
স্কুলের পড়াশোনা করেছেন বর্ধমানের মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে। বাবা অক্ষয়চন্দ্র সেন ছিলেন আইসিএস।
সুকুমার সেনের অন্য দুই ভাইও নিজের নিজের ক্ষেত্রে বিখ্যাত। এক জন, অশোককুমার সেন ছিলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী।
আর এক জন, অমিয়কুমার সেন ছিলেন চিকিৎসক, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনে ছিলেন তাঁর সঙ্গে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হবার পর তিনি সেখানকার প্রথম উপাচার্য পদে বসেন ।
স্মরণীয় মানুষটি হলেন শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন , দেশের প্রথম চীফ ইলেকশন কমিশনার ।
কিন্তু এমন বাঙালিকে মনে রাখিনি আমরা। বিস্মৃতি এতটাই যে কখনও কখনও ভাষাতাত্ত্বিক সুকুমার সেনের সঙ্গে তাঁকে গুলিয়ে ফেলা হয়।
তবু বর্ধমানে একটি রাস্তার নাম তাঁর নামে হয়েছে। আর সম্প্রতি সাত দশকের ভারতের নির্বাচন নিয়ে বিবিধ ইংরেজি প্রবন্ধের একটি সংকলন (দ্য গ্রেট মার্চ অব ডেমোক্রেসি: সেভেন ডিকেডস অব ইন্ডিয়াজ ইলেকশন) উৎসর্গ করা হয়েছে সুকুমার সেন আর টিএন শেষনের নামে।
প্রথম জন নির্বাচন কমিশনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, আর দ্বিতীয় জন তার মেরুদণ্ড শক্ত করেছিলেন।
গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল স্থাপন করে গেছিলেন যে মানুষটি, তাঁর প্রতি আমাদের প্রণাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য🌷🌷

