-এক হতদরিদ্র আদিবাসী পরিবারের শিশুর মৃত্যুকে ঘিরে সম্প্রীতির নজির তৈরি করল গাজোলের সাঁকরোল গ্রাম।
মৃত শিশুর বাবা দাদনে রয়েছেন দিল্লিতে।
শিশুটিকে ময়না তদন্তের জন্য মালদা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া থেকে দাহ করার ব্যবস্থা-যে অর্থের দরকার, ওই পরিবারের তা নেই।
এই অবস্থায় পাশে দাঁড়ান এলাকার বাসিন্দারা।
আদিবাসী বাসিন্দাদের পাশাপাশি দাঁড়ান মুসলিমরাও।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে দেহ নিজেরাই নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বলছেন, ‘আমাদের কিছু হলে মুসলিমরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, আবার ওদের কিছু হলে আমরাও গিয়ে দাঁড়াই।
আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
’ ক্যা-নিয়ে যেখানে অস্থিরাবস্থা গোটা দেশ জুড়ে, সেখানে এই ঘটনা বার্তাবহ বলে মনে করছেন জেলার মানুষ।
ঘটনাটি গাজোল থানার দেওতলা গ্রাম পঞ্চায়েতের সাঁকরোল গ্রামের।
জানা গেছে, মৃত শিশুটির নাম সোমনাথ হাঁজদা। বছর চারেকের শিশুর বাবা সুনীল হাঁজদা। দাদনে তিনি রয়েছেন দিল্লিতে।
সোমনাথরা ২ ভাই, ১ বোন। সে ছিল মেজ। নিতান্তই গরিব পরিবার তাদের।
মা মিনতি মুর্মু ও দিদিমা তেতেসা টুডু পরিচারিকার কাজ করেন। দিদিমা কয়েকদিন আগে ঘরে ইঁদুরের বিষ এনে রাখেন।
ঘরে ইঁদুরের বড্ড উৎপাত। তিনি তাঁর বাক্সে বিষের সঙ্গে চিরা মিশিয়ে প্যাকেটে করে রেখেছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে সোমনাথ বাক্সটি খুলে চানাচুরের প্যাকেট ভেবে ইঁদুর মারার বিষ খেলে ফেলে।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন মা, দিদিমা। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গাজোল গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসা চলার পর গত শুক্রবার সন্ধেয় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় ভেঙে পড়েন পরিবারের সকলে।
এদিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে, দেহের ময়না তদন্ত হবে জানিয় দেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে হাতে কোনও পয়সা নেই তাঁদের। শনিবার সকালে এলাকার কিছু মানুষ পাশে এসে দাঁড়ান।
তারপর সকলে মিলে চাঁদা তুলে দেহ মালদা মেডিক্যাল কলেজে ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে আসেন। আদিবাসী বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ান মুসলিমরাও।
রাজাদুর রহমান সকলের সঙ্গে মর্গেও ছুটে আসেন। তাঁর বাড়ি পাশেই নন্দনপাড়া এলাকায়।
তিনি বলেন,‘আমরা খবর পেয়ে ছুটে আসি সকালে।
তারপর সকলে মিলে ঘুরে ঘুরে কিছু টাকা চাঁদা তুলি। মৃত ছেলের বাবা সুনীল রয়েছেন দিল্লিতে। তিনি কাজে চুক্তবদ্ধ। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়েও তিনি আসতে পারছেন না।
তাই আমরা চাঁদা তোলার ব্যবস্থা করি।’ তিনি আরও জানান,‘শুধু এই ক্ষেত্রেই নয়। হিন্দুদের কিছু হলে আমরা বরাবর ছুটে আসি।
তাদের পাশে দাঁড়াই। ওরাও আমাদের বিপদের সময়ে এসে হাজির হয়। এরকম মেলবন্ধন আমাদের এখানেই পাবেন।’ আদিবাসী বাসিন্দাদের মধ্যে সুদীপ মার্ডি, জেঠা মুর্মু বলেন,‘মৃত পরিবারের তেমন কেউ নেই সে দেহ দাহ করার ব্যবস্থা করে।
আমরাই খবর পেয়ে ছুটে আসি। রাজাদুররাও খবর পেয়ে ছুটে আসেন। আমাদের কিছু হলে ওদের সবসময় পাশে পাই। অন্যান্য দিকে গন্ডগোল হলেও আমাদের মধ্যে কোনও দিনই গন্ডগোলর পরিস্থিতি তৈরি হয় নি। আর হবেও না।’বিধায়ক দিপালী বিশ্বাস বলেন, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে আমাদের রাজ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। এটাই হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি।
এখানে সবার একটাই পরিচয় তা হল মানুষ। সব সম্প্রদায়ের মানুষই এখানে সুষ্ঠুভাবে বসবাস করতে পারেন। বিপদে-আপদে একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ান। আমরা ওই পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে দেখছি।’


