একঝলক দেখে মনে হবে লাউ বা সে ধরণের অন্য কোনও আনাজ ৷
কাছে গেলেই ধারণাটাই পালটে যাবে ৷
লাউ কিংবা চালকুমড়ো নয়, এ হল বাঙালির প্রিয় সবজি বেগুন ৷
লাউয়ের মতোই লম্বা ও সবুজ রঙ ৷ একেকটি ওজনে দেড় থেকে দুই কিলো কিংবা তারও বেশি ৷ চলতি ভাষায় এই বেগুন নবাবগঞ্জের বেগুন নামেই পরিচিত ৷
শীতের মরশুমে এই বেগুনের চাহিদা জেলা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় বিদেশেও ৷
যদিও এই বেগুন চাষের পরিমাণ দিন দিন কমে আসছে ৷
অনেক আগে রতুয়া ২ ব্লকের নাগরি নদীর ধারে কয়লাবাদ গ্রামে এই প্রজাতির বেগুন প্রথম চাষ হয়েছিল ৷
ধীরে ধীরে পুরাতন মালদা ও গাজোল ব্লকের কয়েকটি গ্রামে এই বেগুন চাষ ছড়িয়ে পড়ে ৷
ধোপদুরস্ত চেহারার জন্য এই বেগুনকে প্রথমে পলিয়া বেগুন নামেই চিনত সবাই ৷ সেই সময় জেলার প্রধান হাট ছিল পুরাতন মালদার নবাবগঞ্জে ৷
এই হাটেই পাইকাররা আসতেন ৷ ফলে এই বেগুন নিয়ে সেই হাটেই যেত চাষিরা ৷
এই জন্য ধীরে ধীরে এই বেগুন, নবাবগঞ্জের বেগুন নামে পরিচিতি পায় ৷
সময় বদলেছে ৷ কিন্তু বেগুনের কদর আগের মতোই রয়ে গিয়েছে ৷
তবে এখনও এই বেগুনের চাষ বিস্তৃতি পায়নি ৷ এর অন্যতম কারণ, এই বেগুনের চাষিরা চাষের কৌশল প্রকাশ করে না ৷
এমনকি এই বেগুনের বীজও তারা বাইরে বের করে না ৷ একাধিক বীজ তৈরির সংস্থা এই চাষিদের কাছে বিশেষ বেগুনের বীজ সংগ্রহ করতে গেলেও প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে ৷
তবে বর্তমানে কিছু নার্সারি নিজেদের উদ্যোগে এই প্রজাতির বেগুনের চারাগাছ বিক্রি করে ৷ যদিও সেটা নগণ্য ৷
নবাবগঞ্জের বেগুন এখন মালদার একটা ঐতিহ্য হয়েই দাঁড়িয়েছে ৷ চলতি মরশুমে রতুয়া ২ ব্লকের রাজাপুর গ্রামের মাত্র চারজন চাষি এই বেগুন চাষ করেছেন ৷
তাঁদেরই একজন ফটিক শেখ ৷ তিনি জানান, ''বর্তমানে এই বেগুন আমাদের এখানেই হয়ে থাকে ৷ এই চাষ সবাই করতে পারবেন না ৷
তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহারের পর এই বেগুনের বীজ শোধন করে উন্নতমানের করা প্রয়োজন ৷ এখন প্রতিটি বেগুন দেড় থেকে দুই কিলো ওজনের হয় ৷ আগে একেকটি বেগুনের ওজন অন্তত তিন কিলো হত ৷
কিন্তু ওজন এত হলেও বেগুনে বিচি থাকত না ৷ এখনও দু’কিলো ওজনের বেগুনে কোনও বিচি থাকে না ৷
এই বেগুন এক বিঘা জমিতে চাষের জন্য এখন খরচ হয় ৪০-৫০ হাজার টাকা ৷ তবে এই বেগুন চাষ অত্যন্ত লাভজনক ৷ প্রতি বিঘাতে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ হয় ৷
আমি ১৬ বছর ধরে এই বেগুনের চাষ করছি ৷ এবছর বেগুনের দাম অনেক বেশি ৷ পাইকারদের কাছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কিলো দরে বেগুন বিক্রি হয় ৷
খোলা বাজারে এই বেগুনের দাম কিলোপ্রতি ১০০ টাকাও হয়ে যায় ৷
এবার অতিবৃষ্টিতে বেশিরভাগ জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে ৷ তাই বেগুনের দাম এত বেশি ৷ এই বেগুন চাষের জন্য বিশেষ কৌশল রয়েছে ৷ তবে তা আমাদের গোপন ব্যাপার ৷'
'
ফটিক এই বেগুন চাষের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে না চাইলেও এটুকু নিশ্চিত, নবাবগঞ্জের বেগুন চাষের জন্য পলিমিশ্রিত দোঁয়াশ মাটি প্রয়োজন ৷
সেকারণেই এই প্রজাতির বেগুন চাষের জমিগুলি সবই নদীর ধারে ৷ রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করলে ফলন ভালো হয় ৷
বিশেষত গোবর সার এই বেগুন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ৷ জমির চারপাশ এবং উপরের অংশ জাল দিয়ে ঘিরে রাখতে হবে ৷
যাতে কোনও পাখি কিংবা জন্তু জমিতে প্রবেশ করতে না পারে ৷ রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব কীটনাশক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ৷
সবচেয়ে বড়ো বিষয়, জমিতে জল দাঁড়াতে দেওয়া চলবে না ৷ জলের পরিমাণ বেশি হলে বেগুন গাছ নষ্ট হয়ে যাবে ৷
কোন সময় কতটা জলের প্রয়োজন, একজন বিচক্ষণ চাষিই তা সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন ৷

