*গণতন্ত্র হচ্ছে একটি প্রাচীন শাসন ব্যবস্থার নাম। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক সরকার বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
আধুনিক যুগেও গণতন্ত্র একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল শাসন ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত।
আধুনিক এ যুগকে তাই গণতান্ত্রিক যুগ বলা হয়। অনেক বিবর্তন ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্র বর্তমানে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী একটি শাসন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
গ্রীক নগর রাষ্ট্রসমূহের প্রচলিত সেই অপরিণত গণতন্ত্র এবং আজকের জাতীয় রাষ্ট্রসমূহের গণতন্ত্র, এ দুইটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল মূলত জনগণের জন্য ব্যাপকভিত্তিক কল্যাণের ব্যবস্থা করা।
গণতন্ত্রের ইংরেজি পরিভাষা হচ্ছে- Democracy. এটি গ্রীক শব্দ Demos এবং Kratia থেকে এসেছে। Demos শব্দের অর্থ জনসাধারণ এবং Kratia শব্দের অর্থ শাসন।
অর্থাৎ Democracy শব্দের অর্থ দাঁড়ায় জনসাধারণ বা জনগণের শাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন Democracy বা গণতন্ত্রের উৎকৃষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন : Government of the people, by the people and for the people. G.S. Smill বলেছেন : Admission of all the Share in sovereign power to the state- অর্থাৎ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতায় সকলের প্রবেশাধিকারই হচ্ছে গণতন্ত্র।
সুতরাং বলা যায় যে, যে শাসন ব্যবস্থা জনমতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে তাকে গণতন্ত্র বলে। আর অধিকার বলতে কোনো কিছু করা বা না করার ক্ষমতাকে বুঝায়।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আর্নেস্ট বার্কার বলেছেন : অধিকার হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপযোগী সে সব সুযোগ-সুবিধা যা রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত।
অধ্যাপক লাস্কি বলেছেন : Rights in fact, are those condition of social life without which no man seek is general, to be himself at his best. জাতিসংঘের অন্যতম শাখা ইউনেস্কো কমিটির মতে :
অধিকার হচ্ছে জীবন যাত্রার সে সব সুযোগ-সুবিধা, যা না থাকলে সমাজের নির্দিষ্ট স্তরে মানুষ সমাজের সক্রিয় সদস্য হিসেবে সমাজের কল্যাণ সাধন করতে পারে না।
সুতরাং বলা যায়, অধিকার হচ্ছে-ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশের উপযোগী সে সব অবস্থা যা ব্যক্তির সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধার অনুকূলে এবং যা সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত। আর গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে জনগণের মতামতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা রাষ্ট্র এবং সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত ও সংরক্ষিত অধিকারকে বুঝায়। যে কোন রাষ্ট্রে নাগরিকদের জন্য গণতন্ত্র একটি মৌলিক অধিকার।
গণতান্ত্রিক অধিকার জনগণের জন্য একটি সাংবিধানিক অধিকার। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, এবং চিকিৎসা এ পাঁচটিকে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু এ ছাড়াও কতকগুলো গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিটি নাগরিকের জন্য রয়েছে।
সংবিধান স্বীকৃত সে সব অধিকার থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ভারতের জনগণ ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। আমি এখানে কয়েকটি গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করতে চাই। তাহলো-*
*🌑
১। ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার : গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের বক্তি স্বাধীনতার অধিকার রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের থাকবে যা কেউ হরণ করতে পারবে না। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়তই লক্ষ্য করছি যে, রাষ্ট্র কর্তৃক মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে হরণ করা হচ্ছে।
জনগণ ব্যক্তিগতভাবে ঘর থেকে বের হতে পারছে না। অথচ এ অধিকার নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব সরকারের।
সরকার এ অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ অধিকার সম্পর্কে আমাদের পবিত্র সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারায় পরিষ্কাকারভাবে বলা আছে, No Person shall be deprived of life or personal liberty save in accordance with law. অর্থাৎ “আইন অনুযায়ী জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না”।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠী অনবরত তা লঙ্ঘন করেই চলেছেন। এমনকি পনের বছর বয়সের শিশু এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।*
*
🌑২। আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার : আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়। তাই আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আইন প্রণেতারা আইন প্রণয়ন করেন, কিন্তু নিজেরাই তা মানেন না। জনগণের ওপর মানতে বাধ্য করা হয়। “আবার যখন যারা ক্ষমতার মসনদে সমাসীন থাকেন, তখন তারা মনে করেন আমরা তো শাসক। সুতরাং আমাদের জন্য কিসের আইন? শাসন করাই তো আমাদের মূল কাজ”। তাই আমাদের জন্য সব কিছু বৈধ। সাধারণ লোকেরা আইনের আশ্রয় নিতে গেলে শাসকগোষ্ঠীর লোকেরা হুমকি ধামকিতে অস্থির করে ফেলে। যার ভয়ে জনগণ আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্য আইনি আদালতে গেলে মামলা নেয়া হয় না। সুতরাং এক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক অধিকার ভুলুন্ঠিত হচ্ছে বার বার। এ ব্যাপারে সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে দিক-নির্দেশনা দেয়া আছে*।
*🌑
৩। বাক-স্বাধীনতার অধিকার : কথা বলা বা বাক স্বাধীনতার অধিকার মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। স্বাধীনভাবে কথা বলা না গেলে মনের ভাব বা অভিব্যক্তি পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করা যায় না। কথা না বলতে পারলে একজন ব্যক্তি কি চাচ্ছে, তাও বলা মুশকিল। তাই স্বাধীনভাবে নির্ভয়ে কথা বলার জন্য জনগণকে সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় মনের কথাগুলো এক সময় বিস্ফোরিত হয়ে যেতে পারে। তখন পরিস্থিতি হয়ত আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করছি যে, কেউ সরকারের নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করলেই তাকে হিংস্র থাবার আঁচড়ে পড়তে হচ্ছে। হয় মামলা, না হয় গ্রেফতার, না হয় সম্পত্তি দখল, না হয় বন্ধুক যুদ্ধের নামে ক্রসফায়ার। অথচ আমাদের সংবিধানের ৩৯ নম্বর(২/ক): অনুচ্ছেদে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে, “আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষ, প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (২/খ) : সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল”।*
*
🌑৪। জন নিরাপত্তার অধিকার : মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জন নিরাপত্তা অতি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার। প্রত্যেক ব্যক্তি নির্ভয়ে নিরাপত্তার সাথে জীবন যাপন করতে চায়। আর এটা মানুষের রাষ্ট্রস্বীকৃত অধিকার। নিরাপত্তার সাথে কাজ করা, নিরাপত্তার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, নিরাপত্তার সাথে চাকরি-বাকরি ও পরিবার প্রতিপালন করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সে জন নিরাপত্তা এখন পেট্রোল বোমা অথবা বন্দুকের নলের ভিতর ঢুকে পড়েছে। আলোর মুখ দেখা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।*
*
🌑৫। চলাফেরার অধিকার : চলাফেরার অধিকার সংবিধানসম্মত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। মানুষ স্বাধীনভাবে রাষ্ট্রের যে কোন স্থানে চলাফেরা করতে পারবে এবং যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে ভারত ত্যাগ ও ভারতে অনুপ্রবেশ করতে পারবে। এটা সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত এর উল্টো কর্মকান্ড- পরিলক্ষণ করতে পারছি। চুরি, ডাকাতি, হত্যা, সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির কারণে জনগণ রাস্তা-ঘাটে, অফিস-আদালতে কোথাও স্বস্তির সাথে চলাফেরা করতে পারছে না। নিজেদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে তাই সংকটময় মুহুর্তেও অসহায় মানুষগুলো বাইরে রের হচ্ছে সুস্থতার সাথে। কিন্তু বাসায় ফিরছে, হয় বার্ন ইউনিটের মাধ্যমে অথবা লাশ হয়ে। কেউ কেউ নিখোঁজ হচ্ছে অথবা গুমের শিকার হচ্ছে। কেউ আবার কোটচাঁদপুরের এনামুল এবং আবুল কালামের অবস্থা বরণ করছে। কাউকে আগুন অথবা বোমার সাথে যুদ্ধ করে জীবন দিতে হচ্ছে। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক অধিকারের নমুনা। এ বিষয়ে সংবিধানের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ হুবহু তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সেখানে বলা হয়েছে : “জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে ভারতের সর্বত্র অবাধ চলাফেরা, ইহার যে কোন স্থানে বসবাস ও বসতি স্থাপন এবং ভারত ত্যাগ ও ভারতে অনুপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে”। কিন্তু কোথায় সে অধিকার? এ প্রশ্নগুলো আজ সাধারণ জনগণের মাঝে দোলা দিচ্ছে। যাইহোক, একজন নাগরিক হিসেবে আইনসিদ্ধ সকল অধিকারই হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এ অধিকার দিন দিন ভুলুন্ঠিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেশকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই আসুন, আমরা সরকার, বিরোধী জোট ও জনগণকে সাথে নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা এবং প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি।*
