দেবাশিস মজুমদার, বিশেষ প্রতিবেদক
ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলা আধুনিক গানের প্রধান একটি ধারা রাগাশ্রয়ী সৃষ্টি, তার অন্যতম সার্থক রূপকার মান্না দে। কাকা কিংবদন্তি কৃষ্ণচন্দ্র দে'র শিক্ষার ধারা বেয়ে গড়ে উঠেছিল যার ভিত্তিভূমি। বিভিন্ন রাগের যথার্থ রূপায়নে মান্না দে হয়ে উঠেছিলেন স্বাতন্ত্র্যের এক আইকন। কয়েক দশক ধরে।
রাগের অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্যে আকর্ষণীয় প্রকাশে তাঁর প্রতিভার মৌলিকতা। ফলে সুরের কারুকার্য সাধারণের কাছেও শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে, দুর্বোধ্য লাগে না। এখানে পরিবেশনের মুন্নিয়ানা বা উপস্থাপনাই মূল কথা। এই সহজ, এই সহজ সাবলীল রাগ রূপায়নে জনপদ পেয়েছে মান্না দে-র অজস্র সৃষ্টি। বেসিক রেকর্ড ও ছায়া ছবির গান। যেমন, 'ও চাঁদ সামনে রাখো জোছনাকে' বা 'বাজে গো বীণা' ইত্যাদি। নিজের সুরে যেমন, অন্য সুরকারদের সৃষ্টিতে ও সমান অনবদ্য সাবলীলতা, স্বতঃফুর্ত আমেজ।
কিভাবে সম্ভব হত এই রাগ নিবেদন? সংগীতের অপরূপ অবয়ব নির্মাণ? সংযত আবেগ হোক বা নাটকীয়তা, সার্বিক প্রকাশই যে গানকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে, সে বিষয়ে মান্না দে খুবই সচেতন ও যত্নবান ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস, পরিশ্রম ও সযত্ন অনুশীলনে পৌঁছানো সৃষ্টির সেই সর্বোচ্চ স্তরে, যা তাঁর শিল্পীসত্তার মূল মন্ত্র। জানা যায়, নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতেন না রেকর্ডিং এর সময়। কাজ চালানোর মত বা মোটামুটি পর্যায়ের গান গাইতেন না কিছুতেই। সঙ্গীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কে একটি গানের রেকর্ডিং এর পর অকপটে বলেছিলেন, 'ঠিক আছে নয়, বলুন দারুন হয়েছে। নয়তো আবার গাইবো।'
এই-ই ছিল শিল্পীরা আসল পরিচয়। সেরার সেরাটি তিনি উজাড় করে দিতে চাইতেন। সবসময়ই মনে করতেন, আরও ভালো করার সুযোগ আছে। তার জন্য কোনও পরিশ্রমেই তিনি পিছপা হতেন না। এখানে সময়ের হিসাব মূল্যহীন তাঁর কাছে। এর ফলে গানের মর্মস্থলে অবলীলায় ঢুকে পড়তেন। রাজ কাপুর তাঁকে যে বলেছিলেন, এরকম একজন ভার্সেটাইল সিঙ্গার তাঁর চাই, তার মর্মকথাও এটিই, ঠিকই বুঝেছিলেন। আত্মসন্তুষ্টি মান্না দে-কে গ্রাস করতে পারেনি। তাই তিনি শিল্পীর শিল্পী। যিনি নিজেকে অতি করার অনায়াস সাফল্যে শ্রোতাদের আপলোড করে রাখতে পারেন 'মা' সিরিজের মর্মস্পর্শী নিবেদনে। 'ও আলোর পথযাত্রী'র গায়ক। নিঃসঙ্গ শেষ জীবনের পরম বন্ধু করে নেন রবীন্দ্রসংগীতকে। তাঁর জীবন কাহিনী এক বিরল শিক্ষাই আমাদের ঋদ্ধ করে।