মালদা,
প্রতিবেশী রাজ্য আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা এনআরসি লাগু হতেই কার্যত সন্ত্রস্ত মালদহের নাগরিকদের এক বড় অংশ।
এনআরসি চালু হওয়া এবং এই তালিকায় নাম থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে জোরদার আলোচনার পাশাপাশি ছড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরণের গুজবও।
পুলিস প্রশাসনের আধিকারিকদের অনেকের কানেই এই গুজবের বিষয়টি পৌঁছে গিয়েছে। এনআরসি নিয়ে গুজব বা আতঙ্কের বেশিরভাগটাই ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
উল্লেখ্য, খাদ্যসাথী প্রকল্পে নতুন রেশন কার্ডের জন্য নতুন নাম সংযোজন, পরিশোধন সহ বেশ কিছু কাজ শুরু হয়েছে রাজ্য জুড়ে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই কাজ চলবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
পাশাপাশি ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে ভোটার তথ্য যাচাইয়ের কাজও।
অসমে এনআরসি চালুর প্রায় পরপরই এই দুই কাজ রাজ্যে চালু হওয়ায় অনেক বাসিন্দাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে এই বিষয়গুলির সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীর সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে।
এই ধারণার বশবর্তী হয়েই নাগরিকরা সকাল থেকে লম্বা লাইন দিচ্ছেন বিভিন্ন বিডিও অফিসে। অন্যদিকে ভোটার তালিকা কিংবা আধার কার্ডে ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও তা সংশোধনের জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছেন অনেকেই।
কেউ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের সই করা এফিডেভিট তৈরিতে ব্যস্ত তো অন্যরা ছুটছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জন্ম তারিখের প্রমাণ পত্র তুলতে।
কেউ বা আবার এলাকার শিক্ষিত বাসিন্দাদের কাছে গিয়ে ধর্না দিচ্ছেন বিভিন্ন সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ফর্ম ভরে দেওয়ার আবেদন জানিয়ে কিংবা আবেদনপত্র লিখে দেবার আর্জি নিয়ে।
অনেকে আবার ছুটছেন ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগের ভোটার তালিকার কপি সংগ্রহ করতে।
সব মিলিয়ে উদভ্রান্ত নাগরিকদের অনেকেই স্বীকার করেছেন, আগাম সাবধানতা হিসাবেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করে রাখতে চাইছেন তাঁরা।
কালিয়াচকের বিভিন্ন ব্লক থেকে ইংলিশবাজার প্রায় সর্বত্রই নতুন বা সংশোধিত রেশন কার্ডের আবেদন জমা দেওয়ার জন্য লম্বা লাইনের ছবি চোখে পড়েছে।
কালিয়াচক ১ ব্লকের বিডিও সন্দীপ ঘোষ বলেন, এটা ঠিক লম্বা লাইন পড়ছে। অনেকের মনেই বিভিন্ন বিষয়ে কিছু ভুল ধারণা ছিল। সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে তা অনেকটাই কাটানো গিয়েছে। তবে মানুষকে পরিষেবা দিতে আমরা তিনটির বদলে কাউন্টার বাড়িয়ে সাতটি করে দিয়েছি।
জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা বিধায়ক মোস্তাক আলম বলেন, আমি ইতিমধ্যেই জেলাশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছি যাতে মালদহের সব কয়টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগের ভোটার তালিকা সরকারিভাবে ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রশাসন দেয়।
তাতে আমরা মানুষকে তাঁদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনেকটা উদ্বেগ কাটাতে পারব।
সুজাপুরের কংগ্রেস বিধায়ক ঈশা খান চৌধুরি বলেন, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই অসমে এনআরসি চালু হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে মালদহের নাগরিকদের মধ্যেও।
আমার বিধানসভা কেন্দ্রের অনেকেই উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। বিজেপি’র কিছু নেতার মন্তব্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর আমরা কালিয়াচকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জনসভা করে এনআরসি সংক্রান্ত ভুল ধারণা কাটানোর চেষ্টা করব।
কালিয়াচকের চাকুরিরত হরিশ্চন্দ্রপুরের এক বাসিন্দা বলেন, আগেকার দিনে অনেকেই যত্ন করে কাগজপত্র ঠিক করতেন না।
বুঝতেনও না। খাতায় কলমে আমার বয়স আমার ভাইয়ের থেকে প্রায় ছয় মাস কমে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছি। আতঙ্কিতও রয়েছি।
কালিয়াচক ২ ব্লকের এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, রাতবিরাতে প্রতিবেশীরা আসছেন ভোটার তালিকা বা আধার কার্ডের নাম সংশোধনের জন্য আবেদন লিখে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে।
যতই বোঝাই তাঁদের বিভ্রান্তি রয়েই যাচ্ছে।
তবে জেলা বিজেপি’র প্রচার সচিব অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি, অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়নের দাবি এক সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তুলেছিলেন।
যা হবে নিয়ম মেনেই হবে। যাঁরা দেশের প্রকৃত নাগরিক তাঁদের আতঙ্কের কোনও কারণই নেই।
জেলাশাসক কৌশিক ভট্টাচার্য বলেন, কিছু গুজব ছড়িয়েছে তা আমাদের কানেও এসেছে।
প্রশাসন গুজব রখতে বদ্ধপরিকর। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগের ভোটার তালিকা প্রশাসনের রেকর্ড রুমে রয়েছে। কেউ তা দেখতেই পারেন। রাজনৈতিক দলগুলিকে তা দেওয়ার বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।
