হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের দীর্ঘদিনের মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে আমরা উপলব্ধি। তাঁর গায়কির সাফল্যের চাবিকাঠি হল, দেখনদারি গলায় কাজ নয়, আনায়াস সাবলীলতায় সংগীতের সূক্ষ্ম ও দূরহ কাজ প্রাণবন্ত করে তোলা। জেনো তা কত সহজ, চেষ্টা করলে যে কেউই গাইতে পারে। ফলে লোকের মুখে মুখেও গায়কদের গলায় তা ফিরেছে কয়েক দশক ধরে। সেই অনায়াস, অনুপম কার্যসিদ্ধির আভিজাত্যে তিনি অদ্বিতীয়।
১৯৩৭ থেকে ১৯৮৭, এই পঞ্চাশ বছর তাঁর সঙ্গীত জীবন। এই দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের রহস্য কি,এক কথায়, নিজেকে ক্রমাগত বদলে ফেলা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং অবশ্যই স্বকীয়তা বজায় রেখে। তাঁর গানের ক্রমপর্যায় লক্ষ্য করলে এই বদল এর যথার্থতা ধরা পড়বে। পঙ্কজ মল্লিকের অনুসরনে গান গেয়ে পথ চলা শুরু, পরিচিতি ছোট পঙ্কজ বলে। ক্রমে সেই প্রভাব কাটিয়ে তৈরি করে নিলেন নিজস্ব গায়নভঙ্গি,যা তাঁর স্বর্ণ কণ্ঠের উপযুক্ত। এই ক্রমাগত দিনবদল স্পষ্ট 'দাদার কীর্তি' ছবির 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে' এই জনপ্রিয় রবীন্দ্র সংগীতের গায়ন ভঙ্গিতে, তার নিজের গাওয়া বিখ্যাত গানের রিমেক গুলিতে সেগুলির জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে এই কারণেই তিনি চিরতরুণ, আধুনিক প্রজন্মের কাছেও।
খুব ভালো বুঝতেন, নিজের কন্ঠ গায়কীর জোরের জায়গা কোনটা আর কোনটা নয়। সেইমতো শুরু করতেন, গাইতেনও। অতিরিক্ত টান বা কণ্টকিত রপে প্রধান গান তাঁর পছন্দ ছিল না। সুরকার ও ছবির সংগীত পরিচালক হিসাবে কোন গান কার গলায় সফল হবে তার বিচারে তিনি অভ্রান্ত। এখানেও জ্বলজ্বলে সেই সুগভীর সংগীতবোধ। ফলে সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাস। উদাহরণ, 'হারানো সুর' ছবির 'তুমি যে আমার'। চিরদিনের সেই গান ভারতবর্ষে গীতা দত্ত ছাড়া আর কেউ গাইতে পারবেন না। প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন। বাকিটা ইতিহাস। রবীন্দ্র সংগীত ছিল তাঁর মননে,আবেগে, শিল্পী সত্তায়। এর প্রভাব কাটতে পারেন নি, ফলে আধুনিক এর সুরেও ঘটেছে ছায়াপাত। তবে ওই ব্যারিটোন, অননুকরনীয় কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত যে অপনিত শ্রোতাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সঙ্গীত চেতনায়, তােক ঐতিহাসিক সত্য। আর গীতিনাট্য তাঁর কন্ঠ অপরিহার্য ছিল বিভিন্ন ভূমিকায়, বিশেষত চিত্রাঙ্গদার অর্জুন চরিত্র। রবীন্দ্র সংগীতের জনপ্রিয়তার প্রভাব প্রসারে তিনি অপ্রগন্যের ভূমিকা পালন করেছেন কয়েক দশক ধরে। সলিল চৌধুরীর কথা দিয়ে শেষ করতে হয়-'ঈশ্বর গাইলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় গাইবেন'।