দেশপ্রেম কি তবে নিহত হয়েছে ?




কম‌লে‌শের কলম,,

*না, দেশপ্রেম নিহত হয়নি; তবে বেশ আহত হয়েছে যে সেটা ঠিক। যে জন্য কাতর অবস্থায় পড়ে আছে। কাতরাবে যে এমন জোরও পাচ্ছে না, নিজের মধ্যে। সেবা শুশ্রুষার লোক নেই। তা কার হাতে আহত হলো আমাদের ওই অতি জীবন্ত দেশপ্রেম? অতিজীবন্তই তো ছিল সে এতদিন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা বারবার বিদ্রোহ করেছি, ব্রিটিশ আমলেও তেমনি। বিদ্রোহ যে করেছি সেটা ওই দেশপ্রেমের কারণেই। অনেককাল ধরেই সমষ্টিগতভাবে বাঙালি রাষ্ট্রদ্রোহী, কিন্তু কখনোই দেশদ্রোহী ছিল না।*

*দেশ বলতে কেবল ভূমি বোঝায় না; ভূমি তো বোঝাবেই, কিন্তু দেশ ভূমির চেয়েও বড়, অনেক অনেক বড়, কেননা দেশে মানুষ আছে, মানুষ থাকে এবং সে জন্যই দেশ অমন তাৎপর্যপূর্ণ। দেশপ্রেম বলতে আসলে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসাই বোঝায়।*




*আমাদের এই দেশপ্রেম বারবার পরীক্ষা ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে। অমনভাবে পরীক্ষিত যে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে যুগের পর যুগ ধরে যে যে লড়ছিল, স্বাধীনতার পরে এখন দেখছি তার ভীষণ দুর্দশা। স্বাধীনতার পর ক্রমাগত আঘাত পেয়েছে, পেয়ে পেয়ে এখন বেশ কাতর হয়ে পড়ে রয়েছে। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার, একটি লক্ষ্য ধরে এগচ্ছিল, লক্ষ্যে পৌঁছে দেখে সে আক্রান্ত, বিপদগ্রস্ত। এর অর্থ কী? স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জিত হয়ে গেছে তাই কি দেশপ্রেমের এই নিবীর্য অবস্থা? মোটেই তা নয়। ঘটনা সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তি তো অনেক দূরের কথা, সে তো সহজে আসে না, এসেছে বলে শোনার পরেও বোঝা যায় যে আসেনি; এমনকি স্বাধীনতাও আসেনি। এসেছে যা তা হলো অল্পকিছু লোকের পক্ষে স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ। এরাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখেছে, কখনো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, কখনো বা সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে। এরাই বড় বড় আমলা, খুব বড় ব্যবসায়ী, কেউ বা মোল্লা, ফতোয়া দেয়, কেউ সরকার-সমর্থিত ষণ্ডা, ছিনতাই করে, ধর্ষণও করে থাকে। এরা অপচয় করে, পাচার করে দেয় সম্পদ। দেশকে উৎপাদনকারী হতে দেয় না, করে রাখে ব্যবসানির্ভর, যাতে তাদের সুবিধা হয়; কমিশন পায়। স্বাধীনতা এদেরই। আর এই স্বাধীনতার হাতেই দেশপ্রেম আহত হয়েছে, নিহত যে হয়নি, সেটা আমাদের কপালের জোর।*

*এসব বিলাসী ও উচ্ছৃঙ্খল ক্ষমতাধররা সবাই আত্মপ্রেমিক, এদের মধ্যে দেশপ্রেমের নামগন্ধ নেই। ইতিহাসের মস্তবড় পরিহাস এটা যে, পরাধীনতার কালে আমরা দেশপ্রেমিক ছিলাম। স্বাধীনতার পর উপক্রম হলো দেশপ্রেমকে হারাবার। অনেককাল আমরা পরাধীন ছিলাম। ব্রিটিশের দুইশ বছর, সেই দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হবো, আশা ছিল, ছিল ভরসা; স্বাধীনতার পর দেখা গেল মার খেয়েছে দেশপ্রেম স্বয়ং।*

*দেশপ্রেম এবং আত্মপ্রেম পরস্পর বিরুদ্ধ বটে। কিন্তু প্রকৃত ও আলোকিত দেশপ্রেমের সঙ্গে আত্মপ্রেমের বিরোধ অবশ্যম্ভাবী নয়। কেননা ব্যক্তির মুক্তি তো আসলে সমষ্টির মুক্তির মধ্যেই নিহিত। একা কোন মানুষটা কবে স্বাধীন হয়েছে? দ্বীপে যে থাকে, অথবা বনবাসে, তার তুলনায় পরাধীন আবার কে? দেবতা ও পশুর কথা আলাদা, স্বাভাবিক মানুষ স্বাধীন হয় সমাজের ভেতরে থেকেই। এবং সমাজ যদি নষ্ট হয়, তবে ব্যক্তি কী করে স্বাধীন হবে? যে পুকুরের পানি গেছে পচে, সেখানে কোন্ মাছটা নিরাপদ, শুনি? যে আত্মপ্রেমের চর্চা চলছে আজ ভার‌তে ও ভবিষ্যতে এ দেশ মনুষ্য বসবাসের যোগ্য রইবে এমনটা ভরসা করা সহজ নয়। সত্যি কঠিন।*

*পরাধীনতার যুগে আমরা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়েছি। ব্রিটিশের রাষ্ট্র আমাদের শত্রু ছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রও আমাদের শত্রু ছিল, কিন্তু ভারত রাষ্ট্র? সেও কি শত্রু? শত্রু না হোক, এ রাষ্ট্র জনগণকে স্বাধীনতা দিচ্ছে না এটা ঠিক। এ রাষ্ট্রের কর্তারা স্বাধীনভাবে জনগণের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। এই নির্মম সত্যটাকে তো সাধারণ মানুষকে দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে প্রদক্ষিণ করতে হচ্ছে। জনগণের পক্ষে কেউ নেই। না, নেই। জনগণের জন্য বড় কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা ডাক দেবে দেশপ্রেমের নামে, বলবে রাষ্ট্রের এই পুরাতন স্বভাব বলবৎ রাখার জন্য আমরা লড়িনি; একে বদলানো চাই, বদলাতে হবে*।


*ভারত প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুটি ঘটনা একই সঙ্গে এবং ক্রমাগত বর্ধিত মাত্রায় ঘটেছে। প্রথমটি হলো দেশপ্রেমের পতন, অপরটি বৈষম্যের বৃদ্ধি। এদের আলাদা আলাদা ব্যাপার মনে হবে; কিন্তু আসলে এরা একই বিকাশের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। আর সেই বিকাশটা হলো পুঁজিবাদের। পুঁজিবাদ ছাড়া যে বিকল্প নেই এবং ওটিই যে সবচেয়ে ভালো আদর্শ এই বোধ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে কার্যকর ছিল; পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনের নায়করাও এই আদর্শেই দীক্ষিত ছিলেন। ফলে পুঁজিবাদই কায়েম হয়েছে। আর পুঁজিবাদের নিয়মইতো এটা যে, সে বৈষম্য বৃদ্ধি করবে; ধনীকে আরো ধনী এবং গরিবকে আরো গরিব করে ছাড়বে। সেটাই ঘটেছে; স্বাধীনতা চলে গেছে ধনীদের হাতে, গরিব হয়েছে বঞ্চিত মানুষ। আর ধনী যারা তারাতো আসলে দেশপ্রিমিক নয়, তারা অত্যন্ত স্থূল কদর্যরূপে আত্মপ্রেমিক বটে।*

*দেশপ্রেম থাকা না থাকার বাস্তবতাটা বেশ পরিষ্কারভাবে চোখে পড়ে যদি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকাই। সেখানে ভবিষ্যতের নাগরিকরা সব প্রস্তুত হচ্ছে, আড়ামোড়া ভেঙে। যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ছে, তারা তো স্বদেশপ্রেমের চর্চা করার জন্য মোটেই অঙ্গীকারবদ্ধ নয়। অনেক টাকা বিনিয়োগ করছে, সেই টাকা তুলে নেবে, মুনাফা করবে। মুনাফার এই নগদ লোভটা যে দেশপ্রেমের পৃষ্ঠপোষক নয় সে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। যারা মাদ্রাসায় পড়ছে তারাও দেশের কথাকে অগ্রাধিকার দেবে না, অন্ন চিন্তাকেই প্রধান করবে; এবং পরবর্তীতে যেহেতু তাদের অধিকাংশই জীবন-সংগ্রামে পরাভূত হবে তাই ধরে নিলে খুবই ভুল করা হবে যে, দেশের জনগণের প্রতি ভালোবাসা তাদের মধ্যে উথলে পড়বে। মূলধারা বাংলা মাধ্যমেরই; কিন্তু সেখানেও ভেজাল খুব বেশি; আর ভেজাল জিনিস কখনোই দেশপ্রেমের মতো খাঁটি বস্তুকে উৎসাহিত করতে পারবে না, পারাটা তার স্বভাববিরুদ্ধ।*

*পুঁজিবাদ যে দেশপ্রেমবিরোধী এটা স্বতঃসিদ্ধ। ভারত ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি প্রান্তিক রাষ্ট্র। এর পক্ষে স্বাধীন হওয়া একটি কল্পকাহিনীতে পর্যবসিত হবে বলে আশঙ্কা। কেননা ভারত‌কে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশ্বব্যাপী আয়োজনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে; যে নির্ভরশীলতা মোটেই কমছে না, বরঞ্চ দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, ক্রমাগত।*



*এই যে দেশপ্রেমের বিপুল প্রবাহকে রক্ষা করতে আমাদের ব্যর্থতা, এর জন্য দায়ী কে? এক কথায় বলতে গেলে দায়ী হচ্ছে নেতৃত্ব। নেতৃত্বকে আমরা দোষী করছি আমাদের নিজেদের দায়িত্ব এড়াবার জন্য নয়, করছি নেতারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে।*

*বারবার দেশপ্রেমিক আন্দোলন হয়েছে, আমাদের দেশে। সবক’টিই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, অর্থাৎ অসংগঠিত নয়। সামনে নেতারা ছিলেন, কিন্তু তারা সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, সেটাই আসলে প্রধান দুর্বলতা, নেতারা জানতেন না কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা লড়ছেন। স্পষ্ট ধারণা ছিল না। হয়তো অস্পষ্ট একটা স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তা কী করে অর্জন করতে হবে জানা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বপ্নটাও ছিল অনুপস্থিত। ছিল কেবল একটি নেতিবাচক ধারণা। হটাবার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন, কিন্তু গড়বার ব্যাপারে ছিলেন না।*


*বাস্তবতা হ‌চ্ছে। এক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, অন্য নেতৃত্ব আসে, কিন্তু নতুন নেতৃত্বও বলতে পারে না কোথায় যেতে হবে, লক্ষ্যটা কী?* 
*একাত্তরে বাঙালির রণধ্বনি ছিল, ‘জয় বাংলা’। ওই ধ্বনি এখন সর্বজনীনতা পেয়েছিল যে হানাদার বাহিনীর একজন কর্মকর্তা তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন যে, তার তিন বছরের কন্যাটিও ওই ধ্বনি দিয়ে ছোটাছুটি করত। অথচ পরে ওই ধ্বনি খোদ বাঙালিদের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। আসার কারণ ব্যর্থতার বোধ। বাঙালি পরিচয় একাত্তরে যে সম্মান বয়ে আনতো পরে তা মলিন হয়ে এসেছে- ধারাবাহিকভাবে।*

*নেতৃত্বের ব্যর্থতার কথা বলছিলাম। নেতৃত্ব কেবল যে ব্যর্থ হয়েছে তা তো নয়, জুলুমও করেছে। একটি ছোট ঘটনায় উল্লেখ করা যায়, যেটি নেতৃত্বের চরিত্রকে ধরিয়ে দেয়। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এ একটি দৃশ্য ধরা পড়েছে। এক যুবক খাঁচায় করে একটি টিয়া পাখি নিয়ে যাচ্ছে এবং পাখিটিকে বলছে, ‘বল, জয় বাংলা বল’। অবিকল হানাদার বাহিনীর মতো আচরণ, যারা আটকে-পড়া বাঙালিদের বলত, ‘বল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বল’। পাখি-বহনকারী ওই যুবকটি নেতা ছিল কিনা জানি না, কিন্তু তার মধ্যে বিলক্ষণ নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য ছিল। পুঁজিবাদী নেতৃত্বের।*

✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍✍

AB Banga News-এ খবর বা বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুনঃ 9831738670 / 7003693038, অথবা E-mail করুনঃ banganews41@gmail.com
⏳ নিউজ লোড হচ্ছে...