কমলেশের কলম,
=====================================
*আজকে যদি আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ্য রাখি তাহলে দেখা যাবে গল্প, কবিতা, ভ্রমণ, সেলফি ও মিমস কে পিছে রেখে যেটা খুব দ্রুত সামনে উঠে আসছে সেটা হলো বিদ্বেষ। আগে উগ্রপন্থীরা এইধরণের প্রচার করতো, এখন স্বীকৃত সংস্থা ও দায়িত্বশীল নাগরিকরাও এই একই কাজ করে চলেছে। জেমস বন্ড এর "টুমরো নেভার ডাইস" (১৯৯৭) সিনেমাটা মনে আছে? কেমন করে এক মিডিয়া কিং সমস্ত বিশ্বকে একটি যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে গেলেন। ঠিক তাই আজ ঘটে চলেছে ভারতবর্ষে। যদি আমার কথা পাগলের প্রলাপ বলে মনে হয় তাহলে একজন সন্মানীয় রাজ্যপালের কথা তো মানবেন - যিনি গৃহযুদ্ধের ব্যাপারে কিছু বলেছেন !*
*ভারতবর্ষে এই পরিস্থিতি হলো কেন? উন্নয়নের ইস্যুভিত্তিক রাজনীতি খরচ ও সময়সাপেক্ষ এবং তা যে ভোটের বাক্সে সুফল দেবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বিদ্বেষের রাজনীতি কিন্তু ছত্রাকের মতো বাড়ে ... এবং পাগল-ছাগল ভরা দেশে খুব ভালো ফল দেয় ভোটের বাক্সে। আগে তাই তোষণের রাজনীতি চলতো ... তাতে অনেক খরচ ছিল ... এখন লেটেস্ট চলছে তোষণের উল্টো ... বিদ্বেষের সমুদ্রমন্থন।*
*তাই নারদ নারদ ... লাগিয়ে দাও ... হিন্দু মুসলিমে, বাঙালি অবাঙালিতে, ধনী দরিদ্রে (নোটবন্দি হাসিমুখে মেনে নিলো সাধারণ মানুষ এই ভেবে যে কিছু বড়লোক সর্বহারা হবে !)। উগ্র প্রাদেশিকতার সাথে মিশলো জাতপাতের বিভেদ, অগ্রসর শ্রেণী ও অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল তাকে বহুগুনে বাড়িয়ে তোলা হলো, একটি অঞ্চলের অনুন্নয়ন কে সংখ্যাগরিষ্ঠের শোষণের আখ্যা দেওয়া শুরু হলো, সম্প্রীতি ও সংহতির যে বাতাবরণ মানুষ নিজেই ধরে রেখেছিলো তাকে সুকৌশলে ভেঙে দেওয়া হলো মন বিষিয়ে তুলে। সবাইকে বোঝানো হলো, নিরপেক্ষ বলে কিছু হয় না ... যে কোন একটা পক্ষ নিয়ে প্রতিপক্ষ খুঁজে নিতে হবে ও তাকে আক্রমণ করতে হবে। তবেই দেশের উন্নতি, জাতির উন্নতি, অঞ্চলের উন্নতি, গোষ্ঠীর উন্নতি।*
*সোশ্যাল মিডিয়াকে বুদ্ধি করে ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের মন কে ক্রমাগত বিষিয়ে তোলার জন্যে। আমরা একটা বাক্য বলতাম - এমেকদেলুপুখা - মানে, এলো মেলো করে দে "মা" লুটে পুটে খাই। আজ এই ঘোলা জলে মাছ ধরার জন্যে প্রথমে পয়সা খরচ করে একটা বিতর্কিত মত তুলে ধরা হচ্ছে, আবার পয়সা খরচ করে তার বিরুদ্ধে আরেকটা বিতর্কিত মত সাজানো হচ্ছে ... তারপর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এবার সাধারণ মানুষ নিজেই ছাগলের তিন নম্বর সন্তানের মতো এই দুটি মত নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ি করে মরছে। এতে কি লাভ হচ্ছে? এক: মানুষের মনের সুস্থ ভাবে চিন্তা করার শক্তিকে নষ্ট করে তাকে একটা লড়াকু মেশিন বানানো যাচ্ছে ... দুই: সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে খবরের শিরোনামে থাকা যাচ্ছে। নিজের সপক্ষে আলোচনা করিয়ে খবরের শিরোনামে থাকতে যা কষ্ট, তার থেকে নিজের বিরুদ্ধে আলোচনা করিয়ে ... মানুষকে উস্কে দিয়ে ... সেই খেপে যাওয়া মানুষদের দিয়ে গালাগালি করিয়ে, নিজের সমর্থকদের খেপিয়ে তুলে ... একটা বিশাল কোন্দল তৈরী করে ... অনেক কম কষ্টে খবরের শীর্ষে ওঠা যায়। যাদের আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না ... তারা একটু গুগুলে সার্চ করুন "most talked about political leader on Facebook"*
*ফেসবুক ব্যবহারকারী সবার পক্ষে নামজাদা হয়ে ওঠা সম্ভব নয়, দারুন বিশ্লেষণমূলক লেখা বা আলোচিত সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। কিন্তু সবার মনে রয়েছে উচ্চাকাঙ্খা, সুপ্ত ঘৃণা-বিদ্বেষ, বঞ্চনার স্মৃতি, রাজনৈতিক উগ্রমত, ধর্মীয় অনুভূতি, জ্বালা-যন্ত্রনা ও সর্বোপরি একরাশ বোকামি। তাই একটু সুড়সুড়ি ... আর ছাগলের দল পাগলের মতো নৃত্য আরম্ভ করবে। এই মারণ খেলায় শুধু কমবুদ্ধি মানুষ নয়, বুদ্ধিমান মানুষও জড়িয়ে পড়ছে অজান্তে এবং তার ফল হচ্ছে মারাত্মক ... এরা আরো বেশি করে বুদ্ধি লাগিয়ে নির্বোধের মতো বিদ্বেষের বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের মনে। আর তাতেই ভোটের বাক্স উপচে পড়ছে ... কম খরচে হাতে গরম সুফল।*
*কিন্তু, প্রথম কারণটা আরো মারাত্মক। মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা, মানুষের মনের সুস্থ চিন্তাশক্তি নষ্ট করে দেওয়া। তালে মানুষ আক্রমণ করবে - ডিলিট কেন পেলো? দামী কোট কেন পড়লো? বিদেশে কেন গেলো? উৎসব কেন করলো? মিত্রও কেন বললো? হিন্দি কেন বলতে পারলো না? ... ইত্যাদি প্রভৃতি !*
*কিন্তু, মানুষ বলবে না (খুব কমসংখ্যক মানুষ ছাড়া) রাজা, তোমার কাপড় কই?* *তারা প্রশ্ন করবে না -*
*শিক্ষানীতির কি হলো, কত অর্থ বরাদ্দ? চাকরির কি হলো, বেকারত্বের কি সমাধান? অর্থনীতির কি হাল, মানুষের গড় আয় বাড়ছে না কমছে? স্বাস্থ্যনীতি কি, কত খরচ করছো তুমি, মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে না পাচ্ছে না? - এইসব প্রশ্ন আপনার নিউজ ফিডের সামনে আসবে না ... তাই আলোচনা হবে না - জনমত তৈরি হবে না - নাই চাপ, তো খাপে খাপ ... পুরো পঞ্চুর বাপ্ !*
*উল্টোদিকে যাদের নোটবন্দির সাঁড়াশি দিয়ে গলাটিপে মারার কথা বলে মানুষকে বাদর নাচ করানো হয়েছিল, তারা পৃথিবীর ধনীদের লিস্টে আরো কয়েকধাপ উঠবেন, দেশের সম্পদ লুঠ অব্যাহত থাকবে, গরিব আরো গরিব হবে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মেরুদন্ড আরো বেঁকে যাবে, স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীরা আত্মহত্যা করবে, চাষি আত্মহত্যা করবে, শ্রমিকের অধিকার খর্ব হতে হতে ক্রীতদাসে পরিণত হবে, বেকার যুবক আত্মহত্যা করবে, উচ্চশিক্ষিত চাকুরিপ্রার্থী মর্গে চাকরি নেবে, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করা তরুণ চাকরি খুইয়ে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু কোন প্রশ্ন হবে না ... কারণ? আরে, তুই না হিন্দু, মুসলিমরা দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছে, লড়াই কর! আরে তুই না মুসলিম, হিন্দুরাষ্ট্র তৈরী হচ্ছে, জিহাদ কর। তুই না গোর্খা, তুই না বাঙালি, তুই না অবাঙালি, তুই না কাশ্মীরি, তুই না .... মার্ শালাকে/ ওই তোর প্রতিপক্ষ ... জিন্দা ছাড়িস না ... টাইপ কর ফেসবুকে !*
*একজন পাগল কবির কটা লাইন মনে পড়ে গেলো -*
*"ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,*
*বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন*।
*কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,*
*স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!*
*কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন*
*কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?*
---------------------------
*আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!*
*কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস*
*এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!*
*টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।*
*মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!*
*হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!"*
*স্বরাজের বদলে "আচ্ছে দিন" বা "বিজেপি মুক্ত ভারত" বা "হিন্দু রাষ্ট্র" বা "আইএস এর মুসলিম রাষ্ট্র" বসিয়ে নিয়ে পড়ুন ... আজও প্রাসঙ্গিক !!*
